জামদানীতে ফিউশন নিয়ে ‘অন ক্লাউড নাইন এন্ড হাফ’

'অন ক্লাউড নাইন এন্ড হাফ' এর উদ্যোক্তা আফরিন আহমেদ

বাংলার ঐতিহ্য জামদানী বলতেই সবাই বোঝে শাড়ী। কিন্তু এর প্রতি কিছু মানুষের ভালোবাসা এমন পর্যায়ের যে সম্ভব হলে এরা সবকিছুই এই কাপড় দিয়ে বানায়। নব্বইয়ের দশকে জামদানী কাপড়ের কুশন কভার, পর্দা এরকম কিছু পণ্য বাজারে আসলেও প্রচারের অভাবে তা তেমন পসার পায়নি। ফিউশনধর্মী ডিজাইনার আফরিন আহমেদ এর চিন্তায় প্রায় প্রথম থেকেই ছিল জামদানীর সাথে ফিউশন কী কী উপায়ে করা যায় তা নিয়ে। প্রায় কয়েক বছরের প্রচেষ্টার পর জামদানীর গজ কাপড় ক্রেতার হাতে তুলে দিতে সক্ষম হয়েছেন ‘অন ক্লাউড নাইন এন্ড হাফ’এর কর্ণধার আফরিন আহমেদ।

‘জামদানীর বুনন এবং ডিজাইনগুলো এত বেশি মার্জিত যে এটি দিয়ে শাড়ি বা জামার বাইরেও কিছু নিরীক্ষাধর্মী কাজ করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সেটি করতে গেলেও শাড়ি কাটা ছাড়া উপায় ছিলনা। কেননা তাঁতীরা জামদানী গজ আকারে বানান না। অনেক তাঁতীর দ্বার ঘুরে শেষ পর্যন্ত জামদানীর গজ কাপড় আমরা নিয়ে এসেছি। এখন এটি দিয়ে অনেক নতুন কিছু করা সম্ভব হবে।”-জানান আফরিন।

গজ হিসেবে জামদানী কাপড় এনেছে অন ক্লাউড নাইন এন্ড হাফ

ছোটবেলায় শেখা ‘জীবনের লক্ষ্য’ রচনায় কমবেশি সবাই ডাক্তার কিংবা ইন্জিনিয়ার হতে চায়। আদর্শ পেশা হিসেবে এই পেশাগুলোর বাইরে অন্যকিছুর কথা বলতে গেলে কেউ ভাবেইনা। সেই আদর্শ পেশাতেই ক্যারিয়ার গড়ায় ব্যস্ত ছিলেন আফরিন। মেডিকেলের শিক্ষার্থী হিসেবে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে উচ্চতর শিক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। মাঝপথেই ঘটনাচক্রে দেশের বাইরে পাড়ি জমান। কিন্তু সেই দেশে আবার নতুন করে পড়াশোনার পাট খুলতে আর আগ্রহ হয়নি আফরিনের। এরকম সময়েই খোঁজ মেলে এক ক্রাফটিং এর কাঁচামালের দোকানের। সেই দোকানের প্রত্যেকটা বস্তু তাকে যেন টানছিলো। অনেকটা ঝোঁকের বশে কিছু কাঁচামাল তিনি কিনে ফেলেন। সেগুলো দিয়ে নিজ হাতে কিছু জিনিস বানিয়েও ফেলেন। প্রচুর প্রশংসা পান। এরপর বিখ্যাত শিল্পী জ্যারড ভ্যানডেনবার্গ এর সাথে শিক্ষানবীশ হিসেবে কাজ করারও সুযোগ পেয়ে যান। এইসব ঘটনাগুলোই আফরিনের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পেছনের গল্প। কিছুদিন পর দেশে ফিরে আফরিনের মনে হলো কোথাও যেন একটা তাল কেটে গেছে। দীর্ঘ বিরতির পর কিছুতেই আর যেন পড়াশোনা বা দেশের আগের জীবনে ফেরত যাওয়া যাচ্ছেনা। নিজেকে ডাক্তার ভাবা থেকেও ততদিনে তিনি অনেক দূরে। এ পর্যায়ে আফরিন একটা বিরতি নিলেন। এবং অবাক হয়ে দেখলেন যে এই বিরতিতে তিনি শুধুই সৃজনশীল কাজে মন বসাতে পারছেন। শুরু হলো তার নতুন পথচলা। রং তুলি হাতে করতে লাগলেন একের পর এক সৃষ্টি।

নিজের উদ্যোগ সম্পর্কে আফরিনের বক্তব্য স্পষ্ট। “আমি মালটিটাস্কার না। অখন্ড মনোযোগের সাথে একটা কাজই করি। আমার একেকটা প্রোডাক্টের পেছনে একেকটা গল্প দিতে চাই। আর প্রতিবার সেটাতে থাকে নতুন কিছু যোগ করার চেষ্টা। আমি শতভাগ টার্গেট অডিয়েন্স পাবোনা, তা আমি জানি। যাদের পাবো তাদেরকেও শতভাগ সন্তুষ্ট করতে পারবোনা। কিন্তু আমার চেষ্টা থাকে তাদের ধরে রাখার। ব্যবসা যেকোন ভাবে করে ফেলা যায় হয়তো। কিন্তু আমার কাছে গ্রাহকের সাথে সুসম্পর্কটা অনেক জরুরী।”

আফরিন এর উদ্যোগের গ্রাহক বা শুভাকাঙ্খীদেরও যেন তিনি ঠিক এই বার্তাটিই পৌঁছে দিতে চান তার উদ্যোগের নামের মাধ্যমে। উদ্যোগের এই নামটি আফরিনের সহধর্মীর দেয়া। “ইংরেজি ইডিয়ম ‘অন ক্লাউড নাইন’ মানে অত্যাধিক খুশি বা আনন্দ। আমার উদ্যোগ হচ্ছে তার থেকেও আরেকটু বেশি আনন্দের তাই এটি ‘অন ক্লাউড নাইন এন্ড হাফ’। আমার কাজ আমার গ্রাহকদের আনন্দে ভাসিয়ে দিক, এটাই আমি চাই।”-হাস্যোজ্জল বয়ান আফরিনের। এছাড়াও দেশি বিদেশি সব বন্ধু ও গ্রাহকের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং সহজ একটা নাম দেয়ার উদ্দেশ্যও এই নামকরণের পেছনে রয়েছে বলে জানান তিনি।

বৈচিত্র্যময় ফিউশনধর্মী পোশাক পাওয়া যাবে অন ক্লাউড নাইন এন্ড হাফ-এ

ফিউশনধর্মী পোশাক নিয়ে অনেকের মাঝেই একটা ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে, যে এটি কমবয়সী মানুষের অনুষঙ্গ। এব্যাপারে সম্পূর্ণ ভিন্নমত পোষণ করে আফরিন বলেন, “যেকোন পোশাক নির্বাচন মানুষের ব্যক্তিত্বের উপর নির্ভর করে। রং, ডিজাইন, ধরন এসবকিছু যদি একজন ধারণ করতে পারে তো তার বয়স কিংবা গায়ের রং কোন বিষয় হয়না।”

নিজের উদ্দেশ্য এবং কাজের ব্যাপারে খুবই মনোযোগী এ তরুণ উদ্যোক্তা। সেই সাথে মানসিক সংকীর্ণতাকেই কাজের চ্যালেন্জ হিসেবে দায় দিয়ে তিনি বলেন, ”এই উপমহাদেশে অনেক কাজকেই ছোট বলে মনে করা হয়। কেউ পড়াশোনা করে উদ্যাক্তা হবে তা ভাবতে গেলেই এখনো অনেকে হোঁচট খায়। অনেক উদ্যেক্তা আবার মানসম্পন্ন কাজ না করেই টিকে থাকতে চায়। আমার কাজ ছোট বড় যাই হোক, সেটাই আমি মন দিয়ে করবো- এই সংকল্প থাকাটা খুব জরুরী। তানাহলে নতুন উদ্যাক্তাদের প্রতি গ্রাহক আস্থা হারায় আর এই প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকাটা কঠিন হয়ে পরে।”

ডাক্তারি পেশা ছেড়ে আফরিনের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পথ মোটেও সুগম ছিলনা। আদর্শ পেশা এবং নিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতছানি উপেক্ষা করে, শুধুই নিজের মনের পথে চলা সাহসের নাম ‘অন ক্লাউড নাইন এন্ড হাফ’। আর তাইতো আফরিন প্রতিনিয়ত নিজেকে তৈরী করছেন। স্বপ্ন দেখছেন নিজের ছোট্ট প্রতিষ্ঠানটিকে বড় করে অনেকের কর্মসংস্হানের পথ তৈরী করার। সেই পথে সবকিছু একাই সামলে চলা আফরিন আহমেদ কোন অবস্থাতেই পেছনে তাকাতে চান না। কারণ তার নিজের তৈরী করা পথ তার জন্য অনেক বেশি আনন্দের আর গৌরবের।

ফেইসবুক পেইজের লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/OnCloud9nHalf

শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য