বান্দরবানের পাহাড়ে কাজুবাদাম: ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এলাকার অর্থনীতি

পাহাড়ের বাগানগুলোতে থোকায় থোকায় ঝুলছে কাজুবাদাম। ছবি: সুফল চাকমা

একসময় পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষ কাজুবাদামের সঙ্গে তেমন পরিচিতই ছিলেন না। গাছ থেকে ঝরে পড়ে বাদাম মাটিতেই নষ্ট হতো। কিন্তু এখন সেই কাজুবাদামই বহু কৃষকের জীবনে অর্থনৈতিক পরিবর্তনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

এপ্রিলের শেষ দিক থেকে মে মাসের শুরু পর্যন্ত পাহাড়ি এলাকাগুলোতে গেলে দেখা যায়, কেউ কাজুবাদাম সংগ্রহ করছেন, কেউ গাছ থেকে ছিঁড়ছেন, আবার কেউ রোদে শুকাচ্ছেন।

বর্তমানে পাহাড়জুড়ে কাজুবাদাম চাষিদের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। প্রতি মণ কাজুবাদাম সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ফলে পাহাড়ে এখন অনেক পরিবারের ছোট-বড় কাজুবাগান রয়েছে। কারও কয়েকশ, আবার কারও ২০-৩০ একর জুড়ে হাজার হাজার গাছ।

সম্প্রতি রুমা ও থানচি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তার ধারে এবং বাগানজুড়ে থোকায় থোকায় পাকা কাজুবাদামের ফল ঝুলছে।

থানচি উপজেলার বলিপাড়া ইউনিয়নের ৫নম্বর ওয়ার্ডের দিনতে পাড়ার কারবারি ও কাজুবাদাম চাষী রেইনিং ম্রো (৬৩) জানান, আগে পরিবারের সাত সদস্য নিয়ে তিনি জুমচাষ করতেন। তবে আগের মতো ফলন না হওয়ায় এখন স্থায়ীভাবে কাজুবাদাম চাষে মনোযোগ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমার ২৫ একর জমিজুড়ে প্রায় ২ হাজার কাজুবাদাম গাছ আছে। গতবছর ফলন তেমন ভালো হয়নি তারপরও ২৭ মণ কাজু বাদাম বিক্রি করে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ টাকা পেয়েছি। এবছর ভালো ফলন হয়েছে তাই গতবছরের দ্বিগুন -৫৪মণ ফলনের আশা করছি, এতে প্রায় ২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা আয় হতে পারে বলে জানান তিনি।”

এক কৃষকের ঘরের মাচায় কাজুবাদাম শুকানো হচ্ছে।

একই ইউনিয়নের থাংনাং পাড়ার লংছাই খুমী (৪৫) জানান, তার ১৫ একরজুড়ে কাজুবাদাম বাগান রয়েছে। গত বছর ৫০ মণ কাজুবাদাম প্রতিমণ ৬ হাজার ৬ শত টাকা দরে বিক্রি করে ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা আয় করেছিলেন। চলতি বছরও একই ধরনের ফলনের আশা করছেন তিনি।

থানচি উপজেলার কমলা বাগান পাড়ার বাজেরুং ত্রিপুরা (৫০) জানান, তিন বছর আগে বিভিন্ন ফলদ বাগানের পাশাপাশি কাজুবাদাম চাষ শুরু করেন। গতবছর ৩০০ গাছ থেকে ২০ মণ কাজুবাদাম বিক্রি করে ১ লাখ ১২ হাজার টাকা আয় করেন। এবছর ৪০ মণ ফলনের আশা করছেন বলে জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, আগে পুরোপুরি জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে জুমে ফলন কমে যাওয়ায় বিভিন্ন ফলদ বাগান ও কাজুবাদাম চাষ করে লাভবান হচ্ছেন।

বান্দরবান উপশহর বালাঘাটায় অবস্থিত কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান কিষাণঘর এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেকুল ইসলাম জানান, গতবছর তারা মণপ্রতি কাজুবাদাম সাড়ে সাত হাজার থেকে আটহাজার টাকা দরে কিনেছিলেন। চলতি বছর এখনও ক্রয় কার্যক্রম শুরু হয়নি, তবে শিগগিরই শুরু হবে।

তিনি বলেন, ২০২০ সাল থেকে কিষাণঘর চালু করেছেন। এখানে ৭৪জন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। কিন্তু ব্যাংক থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কৃষিঋণ পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিষ্ঠান হিসেবে যেমন ঋণ পাচ্ছেন না, তেমনি তাদের ১২০০ কৃষকও কৃষিঋণ থেকে বঞ্চিত। তার ভাষ্য, কৃষিঋণের অভাবে অনেক কৃষক দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে আগাম কম দামে কাজুবাদাম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাই ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে কাজুবাদাম চাষিদের জন্য কৃষিঋণের ব্যবস্থা করার জোর দাবি জানান তিনি।

বান্দরবান কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ হাজার ৫৫৬ হেক্টর জমিতে কাজুবাদাম আবাদ হয়ে উৎপাদন হয়েছে ১ হাজার ৪৬০ মেট্রিকটন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ হাজার ৬১৯ হেক্টরে উৎপাদন হয়েছে ১ হাজার ৬০৬ মেট্রিকটন। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৭১১ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ১ হাজার ৭৮১ মেট্রিকটন কাজুবাদাম।

বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আবু নঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলেন, বান্দরবানে কফি ও কাজুবাদাম অত্যন্ত লাভজনক অর্থকরী ফসল। কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি প্রদর্শনী বাগানও করা হচ্ছে। ফলে দিন দিন কাজুবাদামের আবাদ বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, কাজুবাদাম গাছ রোপণের ৩-৪ বছর পর ফলন আসে। তাই এটি সময়সাপেক্ষ হলেও লাভজনক হওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। ভবিষ্যতে আবাদ আরও বাড়বে এবং কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে আরও লাভবান হবেন বলে জানান এই কৃষিবিদ।

শেয়ার করুন