বান্দরবানের দুর্গম আলীকদম -থানচি সীমান্তবর্তী এলাকায় একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক বন উজার ও কাঠ পাচারের অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবী, পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণ, ঝিরির পানিপ্রবাহ বন্ধ এবং শতবর্ষী মাতৃগাছ নির্বিচারে কাটার ফলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
জানা গেছে, জেলা সদর থেকে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার এবং আলীকদম উপজেলা সদর থেকে ১৭কিলোমিটার দুরের চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের ৯নম্বর ওয়ার্ডের পামিয়া ম্রো পাড়া,তন্তুই পাড়া, নামচাক পাড়া, কাকই পাড়া, আদুই পাড়াসহ আশেপাশের এলাকায় এই প্রাকৃতিক বন ধ্বংসযজ্ঞ চলছে।
আলিকদম -থানচি সড়কের ১৭কিলোমিটার অংশ অতিক্রম করে আরও প্রায় এক ঘন্টা হেঁটে গেলো পোলা ব্যাঙ ঝিড়ি এলাকায় গিয়ে এই ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়।

সোমবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়,পোলা ব্যাঙ ঝিরির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ করে পাহাড় কেটে ট্রাক চলাচলের উপযোগী রাস্তা তৈরী করা হয়েছে। দুর থেকে দেখলে মনে হয় যেন উন্নয়নের কাজ চলছে। কিন্ত কাছাকাছি গেলে দেখা যায় শত বছরের পুরনো মাতৃগাছ প্রায় বিলীন। যন্ত্রচালিত করাত দিয়ে গত দুই বছর ধরে গাছ কাটা হচ্ছে।
শ্রমিকদের থাকার অস্থায়ী আবাস, সোলার সিস্টেম,, নামাজের জন্য অস্থায়ী মসজিদও তৈরি করা হয়েছে।
ঝিরির ওপর পাহাড় কেটে তৈরি করা সড়কের দুই পাশে স্তুপ করে রাখা হয়েছে বিভিন্ন আকারের গাছের গুঁড়ি। বহু গাছ অর্ধেক কেটে ফেলো রাখা হয়েছে। এসব গাছের দৈর্ঘ্য ৬০ থেকে ১০০ফুট এবং প্রস্থ ১০থেকে ১৫ফুট। অভিযোগ রয়েছে, জোত পারমিটের ‘কাগজ’ দেখিয়ে অধিকাংশ কাঠ পাচার করা হচ্ছে, আর কিছু কাঠ আলীকদমের অবৈধ ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে।
সোমবার পর্যন্ত এক্সকেভেটর দিয়ে পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরির কাজ চলতে দেখা গেছে।
স্থানীয়রা জানান, কিছুদিন আগে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেওয়া হলেও এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে বর্তমানে পামিয়া ম্রো পাড়াসহ পাঁচটি পাড়ায় দেখা দিয়েছে তীব্র খাবার পানির সংকট।
অভিযোগ অনুযায়ী, আলীকদমের আবুহান মোঃ ইসমাইল এর নেতৃত্বে একটি চক্র ব্যাঙঝিরি এলাকা থেকে গত দুই বছর ধরে প্রায় ৩০জন শ্রমিক দিয়ে গাছ কেটে পাচার করছে, কাটা গাছের মধ্যে রয়েছে গর্জন, চাম্পা, কড়ই, বৈলাম, গুটগুটিয়া, লালি ও চাপালিশসহ নানা প্রজাতির বনজ গাছ। এতে ঝিরি শুকিয়ে গেছে এবং অন্তত পাঁচটি পাড়ার ম্রো জনগোষ্ঠী পানি সংকটে পড়েছে। দুই বছর আগেও এই এলাকায় ঘন বন ও বন্যপ্রাণীর বিচরণ ছিল বলে জানান স্থানীয়রা।
শ্রমিক শামসুল আলম বলেন, তিনি ১৯দিন ধরে গাছ কাটার কাজে নিয়োজিত আছেন। তাঁর বাড়ি কক্সবাজার জেলা চকরিয়া উপজেলায়। শ্রমিকদের টিম লিডার মাঝি ইসমাইল জানান, তিনি চকরিয়া উপজেলা হাঁসের দীঘি এলাকা থেকে দৈনিক ৫০০টাকা মজুরিতে তিন মাস ধরে ৮জন শ্রমিক দিয়ে গাছ কাটছেন, আবুহান মোঃ ইসমাইল সওদাগরের অধীনে কাজ করছেন এবং প্রতিদিন একটি ট্রাকে দুইবার করে কাঠ পরিবহন করা হয়। এদিকে লুংলেই ম্রো বলেন, তাঁর বাবা চাহ্লা ম্রো ৫০ একর প্রাকৃতিক বন ৪০হাজার টাকায় পাঁচ বছরের জন্য ইসমাইল সওদাগরের কাছে বিক্রি করেছেন। কিন্তু ইসমাইল প্রায় ২০০ একর এলাকা থেকে গাছ কাটছেন। তিনি অভিযোগ করেন ইসমাইল তার বাবাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে তিনি সাংবাদিক, বন বিভাগ ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করবেন এবং কোন অসুবিধা হবেনা।

পামিয়া পাড়া, তন্তুই পাড়া, নামচাক পাড়া, কাকই পাড়া ও আদুই পাড়াসহ অন্তত পাঁচটি পাড়ার শতাধিক ম্রো পরিবার এই বন ও ব্যাঙঝিরির খালের পানির উপর নির্ভরশীল। এছাড়া লামা উপজেলার রুপসী পাড়া ইউনিয়নের সাঙক্রাত ম্রো পাড়া ও কুইরিং ম্রো পাড়ার মানুষও এই পানি ব্যবহার করে থাকে। আদুই পাড়ার কার্বারী কামপ্লাত ম্রো বলেন এই ব্যাঙঝিরির পানির ওপর ৭-৮টি পাড়া নির্ভরশীল। এখন আমরা পানির জন্য হাহাকার করছি। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিয়েও কোন প্রতিকার পাইনি। নামচাক পাড়ার মেন রাও ম্রো বলেন দুই বছর আগেও এখানে হরিণ, ভালুকসহ নানা বন্যপ্রাণী ও পাখি ছিল। এখন বনও নেই, প্রাণীও নেই।
পামিয়া পাড়ার মেন চং ম্রো বলেন আগে ঝিরিতে প্রচুর পানি ও মাছ-কাকড়া ছিল। এখন পানি শুকিয়ে গেছে। পাড়াবাসী পানি নিয়ে চরম সয়কটে আছি।
মাঙ্গুম মৌজার হেডম্যান রেংপুং ম্রো”র বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায় নি।
অভিযুক্ত আবুহান মোঃ ইসমাইল সওদাগর তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি জুম থেকে মরা গাছ লাকড়ি হিসেবে ১৫হাজার টাকায় চাহ্লা ম্রো”র কাছ থেকে কিনেছেন এবং আজ মঙ্গলবার থেকে গাছ কাটা বন্ধ রেখেছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভুমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের বান্দরবান চ্যাপ্টারের সভাপতি জুয়ামলিয়ান আমলাই বলেন, ইসমাইল নামের একজন অসাধু ব্যবসায়ী দুই বছর ধরে প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে কাঠ পাচার করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এক্ষেত্রে বনবিভাগের সহযোগিতা ছাড়া কোনভাবেই দুই বছর যাবৎ অবৈধভাবে বন উজাড় করা সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তন রোধ কল্পে, জীববৈচিত্র্য রক্ষার্থে অবশ্যই অবৈধ কাঠপাচার রোধ করতে হবে, এই কাজে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে বলে জানান তিনি।
২৯০ নম্বর মাংগু মৌজার হেডম্যান রেংপুং ম্রো”র ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও যোগাযোগ করা সম্ভব না হওয়ায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বন বিভাগের তৈন রেঞ্জ কর্মকর্তা খন্দকার আরিফুল ইসলাম তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সংশ্লিষ্ট এলাকায় বনবিভাগের কার্যক্রম নেই। তবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের সাথে সমম্বয় করে সরেজমিনে তদন্ত করা হবে, প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে অবৈধ কাঠ পাচার হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
আলিকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম বলেন, প্রাকৃতিক বন থেকে গাছ পাচার করার বিষয়ে অবগত নন। প্রয়োজনে পুলিশ ফোর্স নিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
বন বিভাগের লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অতঃপর প্রশাসনের অভিযান
এদিকে প্রাকৃতিক বন ধ্বংস ও কাঠ পাচার নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম এলাকায় অভিযান চালিয়েছে প্রশাসন। অভিযানের সময় কাঠ পাচারকারীরা পালিয়ে গেলেও তাদের ব্যবহৃত এক্সকেভেটর অকেজো করা হয়েছে এবং শ্রমিকদের অস্থায়ী আবাস গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২২এপ্রিল) উপজেলার চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের পামিয়া পাড়া এলাকার ব্যাঙঝিরি এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আলিকদম উপজেলার পানবাজার এলাকার কাঠ ব্যবসায়ী মো.ইসমাইলের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় কেটে এবং ব্যাঙঝিরির স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ করে প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে আসছিল। প্রায় দুই বছর ধরে ৩০জনের বেশি শ্রমিক নিয়োগ করে তারা মূল্যবান মাতৃগাছ কেটে পাচার করছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এবিষয়ে সরেজমিনে প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রশাসনের নজরে আসে বিষয়টি ।
স্থানীয় এলাকার বাসিন্দা লাই রুন ম্রো জানান, প্রশাসনের এ অভিযানে স্থানীয়দের মাঝে স্বস্তি ফিরলেও বন ধ্বংসের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।
অভিযান সম্পর্কে বনবিভাগের তৈন রেঞ্জ কর্মকর্তা খন্দকার আরিফুল ইসলাম জানান, দিনব্যাপী পরিচালিত অভিযানে প্রায় ৩০০ঘনফুট বনজ কাঠ জব্দ করা হয়েছে। অবৈধভাবে পাহাড় কাটায় ব্যবহৃত একটি স্কেভেটর অকেজো করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অবৈধ করাত কলের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
আলিকদম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি তদন্ত) আমজাদ হোসেন বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এর নেতৃত্বে পুলিশ ফোর্স নিয়ে দুর্গম এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে ঘটনাস্থলে কাউকে পাওয়া যায় নি। ব্যবহৃত এক্সকেভেটরটি অকেজো করা হয়েছে।
এ বিষয়ে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম বলেন, দুর্গম এলাকায় সারাদিন অভিযান চালিয়েও কোন শ্রমিককে পাওয়া যায়নি। তবে একটি এক্সকেভেটর পাওয়া গেছে, সেটি অকেজো করা হয়েছে। এছাড়া অবৈধ করাত কলের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে। এসব করাত কলেই প্রাকৃতিক বনের গাছ সরবরাহ করা হয়। তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হবে বলে জানান তিনি।


















