বান্দরবানে বেড়াতে আসা পর্যটক মোঃ সারোয়ার সাইফুল লিখেছেন, “বান্দরবান চিম্বুক পাহাড়ে হারিয়ে যাওয়া ঘড়িটি আপনাদের সহযোগিতায় ফিরে পেলাম। এই গ্রুপের সকল সদস্য ও এডমিন প্যানেলদের নোয়াখালী জেলার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাই।” তিনি চিম্বুক এলাকায় বেড়াতে গিয়ে হাতঘড়ি হারিয়ে বান্দরবানবাসী গ্রুপে পোস্ট দিয়েছিলেন। গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে কেউ সেই ঘড়িটি খুঁজে পেয়ে তাঁকে ফেরত দিয়েছেন।
প্রিন্স নিদোল নামে গ্রুপের এক সদস্য এডমিনকে মেনশন করে লিখলেন, “দাদা আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আপনার দেওয়া নাম্বার থেকে পেয়ে গেলাম ও-পজিটিভ রক্ত।”
এলাকার একজন সিএনজি ড্রাইভার মোঃ এমরান। তিনি গ্রুপে পোস্ট করেছেন, “আমার সিএনজি গাড়িতে একটি ভিভো মোবাইল পাওয়া গেছে, কারো হয়ে থাকলে উপযুক্ত প্রমাণ দিয়ে নিয়ে যাবেন।”
নিউ জাই খেয়াং নামে এলাকার এক বাসিন্দা লিখেছেন, “আমি কৃতজ্ঞতা জানাই বান্দরবানবাসী পেজের সংশ্লিষ্ট সকলকে। কারণ, খেয়াং ছাত্রাবাসের শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষক খুঁজতে গিয়ে অনেক সাড়া পেয়েছি। যদিও অনেকের মেসেজের রিপ্লাই দিতে পারিনি। এজন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। তাছাড়া, বান্দরবানবাসী পেজের সহযোগিতায় আমি দু’জন শিক্ষক পেয়েছি। সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। বান্দরবানবাসী পেজের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করছি।”
কোরবানীর ঈদের সময় কৃষক ও খামারী অথবা তাদের পরিবারের সদস্যরা এই গ্রুপে পোস্ট দিয়ে সরাসরি কোরবানীর পশু বিক্রি করেছেন। ক্রেতারা কোনো মধ্যস্বত্ত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি পশু কিনেছেন খামারীদের কাছ থেকে।
কখনো আবার স্থানীয় কৃষক, ফল বাগানচাষীদের পরিচিতিমূলক পোস্ট দিচ্ছেন কেউ কেউ। এর মাধ্যমে বাইরের ক্রেতারা সরাসরি সেইসব কৃষকদের সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন।
গ্রুপের অফিসিয়াল ফেইসবুক পেইজটিতে এ রকম শত শত উদাহরণ রয়েছে।
গত ১০ বছরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে “বান্দরবানবাসী” নামক গ্রুপের মাধ্যমে এলাকার বাসিন্দা ও পর্যটকরা তাদের অসংখ্য সমস্যার সমাধান পেয়েছেন। পারষ্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে গড়ে উঠেছে দেড় লাখেরও বেশি সদস্যের এক শক্তিশালী সোশাল নেটওয়ার্ক।
এলাকাবাসীর সাথে এই গ্রুপে যোগ দিয়েছে জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ, সদর হাসপাতাল, পৌরসভা, সমাজ সেবা বিভাগসহ আরো বেশ কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল ফেইসবুক আইডি। সরকারি বিভিন্ন জরুরি ঘোষণা, জনসচেতনতামূলক প্রচারসহ নানা কাজে সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং জনগণ এখানে এক সুতোয় গাঁথা।
জুলাই ২০২৬ এর মাঝামাঝি ভয়াবহ বন্যার সময় গ্রুপে অনেক বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন নাগরিক সাংবাদিকরা। ঘণ্টায় ঘণ্টায় বন্যাপরিস্থিতি, রাস্তাঘাটের অবস্থা, কোথায় কী সমস্যা হচ্ছে সবকিছুর সর্বশেষ খবর নিয়ে তারা হাজির হয়েছেন বান্দরবানবাসী গ্রুপে। বিভিন্ন জায়গায় মাটি ধ্বস ও গাছ পড়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের আপডেট জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। মোটকথা, বন্যার সময় গ্রুপের সদস্যদের শত শত পোস্টের মাধ্যমে পুরো বান্দরবানের ঘটনা জানা গেছে এই গ্রুপ থেকেই। গ্রুপের এডমিন ও মডারেটররা দিন-রাতের বেশিরভাগ সময় ব্যস্ত থেকেছেন এসব পোস্ট সঞ্চালনার কাজে।
দেশের বিভিন্ন জেলার পর্যটকরা ওই সময় গ্রুপে পোস্ট দিয়ে এলাকার সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে খবর নিয়েছেন। কেউ কেউ ত্রাণ নিয়ে আসার আগে গ্রুপ মেম্বারদের মতামতের ভিত্তিতে পরিকল্পনাও সাজিয়েছেন।
গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও এডমিন ফরিদুল আলম সুমন জানান, নিজের সাংবাদিকতা পেশার পাশাপাশি এলাকার মানুষকে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে একত্রিত করার উদ্দেশ্যে ২০১৭ সালের ১৭ জুলাই “বান্দরবান পৌরবাসী” নামে গ্রুপটি চালু করি। প্রথমে বান্দরবান পৌর এলাকার বিভিন্ন নাগরিক সংকট, সম্ভাবনা ও দাবি-দাওয়া নিয়ে গ্রুপে লেখালিখি হতো। আমরা মূলতঃ নাগরিক সাংবাদিকতাকে শক্তিশালী করতে চাইছিলাম। পরে সেটাকে আরো বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার জন্য নাম পরিবর্তন করে “বান্দরবানবাসী” করা হয়। ক্রমে ক্রমে গ্রুপের মডারেটর হিসেবে যোগ দেন স্থানীয় ৭ জন তরুণ-তরুণী। তারা গ্রুপে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। ২০২৬-এ আমরা সোশাল মিডিয়ার দায়িত্বশীল ব্যবহারের মাধ্যমে বান্দরবান জেলার জনগণের ডিজিটাল ক্ষমতায়নের পথে হাঁটছি। পর্যটকসহ দেশ-বিদেশের মানুষের জন্য আমরা ‘ক্রাউডসোর্সিং’-এর মাধ্যমে একটা কার্যকর তথ্যপ্রবাহ গড়ে তোলার কাজ করছি।
গ্রুপের উদ্যোগে বান্দরবানের স্থানীয় উদ্যোক্তাদেরকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জেলার প্রথম “অনলাইন উদ্যোক্তা মেলা”র আয়োজন করা হয়। যেখানে ২৫ জন স্থানীয় উদ্যোক্তা অংশ নেন।
ক্রীড়ামোদী তরুণদের উৎসাহিত করতে ২০২২ ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের ‘প্রেডিকশন গেইম’ এর আয়োজন করে বান্দরবানবাসী গ্রুপ। সে সময় স্পন্সর হিসেবে অংশ নেয় স্থানীয় কোচিং সেন্টার, ব্যাংক ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
২০২৫ সালে গ্রুপের সদস্যদের “সাইবার নিরাপত্তা” এবং ”দায়িত্বশীল ডিজিটাল আচরণ” বিষয়ে “স্মার্ট নেটিজেন” অনলাইন কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। কয়েকশ’ প্রতিযোগীর মধ্য থেকে সঠিক উত্তরদাতাদেরকে পুরস্কৃত করা হয় তখন।
এসব ছাড়াও বান্দরবানবাসী গ্রুপের মাধ্যমে নতুন-পুরাতন জিনিস বিক্রি ও বিনিময়, এলাকার যে কোনো জরুরি ঘোষণা প্রচার, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের বিজ্ঞপ্তি প্রচার, জমিজমা বিক্রিতে মধ্যস্বত্ত্বভোগী এড়িয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন, বাসা ভাড়া দেওয়া-নেওয়া, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠান ও পণ্যের প্রচার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভর্তি বিজ্ঞপ্তি, বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সেবার প্রচারণা, এলাকাভিত্তিক সংবাদ শেয়ারসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন সদস্যরা।
গ্রুপের এডমিন জানান, দেশের অন্যান্য শহরে যেমন দেওয়ালে দেওয়ালে বাসা ভাড়া, ব্যাচেলর মেস ভাড়া, দোকান ভাড়া, পড়াতে চাই, টিউটর দিচ্ছি- এসব বিজ্ঞাপন দেখা যায়, বান্দরবানে তা হয় না। কারণ এখানকার মানুষ শহরের দেওয়াল নোংরা না-করেই এই বড় ফেইসবুক গ্রুপটাতে পোস্ট দিয়ে নিজেদের সব প্রয়োজন মিটিয়ে নিচ্ছেন। এবং এটা দারুনভাবে কাজ করছে।
২০২৬ সালের জুন মাস থেকে চালু করা হয়েছে “বান্দরবানবাসী ব্লাড ডোনার ডাটাবেইজ”। এই ওয়েব-এপের মাধ্যমে জরুরি প্রয়োজনে মাত্র তিন ক্লিকে সরাসরি রক্তদাতাদের সাথে যোগাযোগ করা যায়। রক্তদানে আগ্রহীরাও এই এপের মাধ্যমে মাত্র ১ মিনিটে রেজিস্ট্রেশন করতে পারেন। রক্তদাতা সন্ধানের এপটিতে সহজে ব্রাউজ করার জন্য জেলা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কিউআর কোড স্থাপন করার কাজও চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন এডমিন ফরিদুল আলম সুমন।
গ্রুপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য, সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তর এবং এডমিন প্যানেলের সাথে যোগাযোগের তথ্য সম্বলিত নিজস্ব ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে।


















