শহুরে কিষাণী কাকলী

কাকলি খান নিজেকে কিষানি পরিচয় দিতেই ভালোবাসেন। অথচ তাঁর আগের পাঁচ প্রজন্মের কেউ নাকি কৃষিকাজের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন না। যে পরিবারে তাঁর বিয়ে হয়েছে, তাঁদেরও কেউ কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত নন। একটা বিত্তশালী পরিবারের সদস্য হয়েও তিনি কেন কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত হলেন, সে গল্প পরে। তার আগে পরিচিত হতে হবে ‘শুদ্ধ কৃষি’র সঙ্গে।

রাজধানীর গ্রিন রোডে ধানমন্ডি ক্লিনিকের নিচতলায় ‘শুদ্ধ কৃষি’র অবস্থান। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা প্রাকৃতিক ও জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিক্রি করা হয় এখানে। রাসায়নিক মিশ্রিত ও ভেজাল খাবারের ভিড়ে নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা দিতেই এই উদ্যোগ গড়ে তুলেছেন কাকলি খান।

‘উদ্যোগের ভাবনাটা এসেছে কাছের এক মানুষের মৃত্যুর পর। তাঁর দুটি কিডনি নষ্ট হয়ে যায়। উন্নত চিকিৎসা করানোর সময়ও পাইনি আমরা, খুব দ্রুত ঘটে গেছে সবকিছু। তিনি আমাকে খুব ভালোবাসতেন। তাঁর মৃত্যুটা আমাকে ভীষণ নাড়া দিয়েছিল’—কাকলির স্মৃতিতে ভেসে আসে শাশুড়ির কথা, যিনি একই সঙ্গে তাঁর ফুপুও; মারা গেছেন আট বছর আগে।

তখন একটা প্রশ্ন আসে কাকলির মাথায়—কেন দ্রুত কিডনি অকেজো হয়ে গেল তাঁর ফুপুর? বিভিন্ন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তাঁকে জানালেন, রাসায়নিক ও ভেজাল খাবার ক্যানসার, কিডনি ও যকৃতের জটিল রোগ সৃষ্টিতে দায়ী। বর্তমান সময়ে এসব রোগের হার ক্রমেই বেড়ে চলেছে। কাকলি প্রতিজ্ঞা করেন, তাঁর পরিবারকে আর রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও ফরমালিন মেশানো খাবার খাওয়াবেন না।

কীভাবে সেই উপায় বের করলেন সেটিই বলছিলেন কাকলি, ‘ফরমালিনমুক্ত কৃষিপণ্যের খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় ছুটে বেড়িয়েছি। পরে মনে হলো, আমার ফুপু সারা জীবন মানুষের জন্য অনেক করেছেন। তাঁর জন্যও আমার কিছু করা দরকার। আমি যদি কিডনির রোগী, ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী বা গর্ভবতী মায়েদের জন্য যদি কিছু করতে পারি, সেটা আমার ফুপুর জন্যও করা হবে। এটা নিয়ে পরিবারের অনেকের সঙ্গে কথা বললাম। কিন্তু সবাই উড়িয়ে দিল!’

তবু থেমে থাকেননি কাকলি। শুরুতেই কুষ্টিয়ায় এক আত্মীয়ের গ্রামে খামার করলেন। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই সেটি বন্ধ হয়ে গেল। পরে চুয়াডাঙ্গায় তাঁর মামার বাড়িতে আরও একটা খামার করলেন। সেটাও খুব বেশি দূর এগোয়নি। বারবার বাধার মুখে পরেও হতোদ্যম হননি। ছুটে গেছেন বিভিন্ন গ্রামে, বিভিন্ন জেলায়। কাকলি জানালেন, ৩৭টি জেলায় কৃষকদের সঙ্গে গড়ে উঠেছে তাঁর নেটওয়ার্ক। সর্বশেষ কেরানীগঞ্জের রোহিতপুরে ১২ বিঘা জমির ওপর গড়ে তুলেছেন একটা খামার। তাঁর খামার দেখাশোনা করেন রাজু নামের এক খামারি। কাকলি সপ্তাহে অন্তত এক দিন যান সেখানে। এই খামার থেকে সবজি আসে ‘শুদ্ধ কৃষি’তে। তাঁর আরেকটা দল কাজ করে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায়। সেখানে একটি গ্রাম থেকে কৃষিপণ্য আসে বাসে করে। এতে কর্মসংস্থান হয়েছে ওই গ্রামের অনেক নারীর। শুক্র ও মঙ্গলবার হচ্ছে ‘শুদ্ধ কৃষি’র হাটবার। এই দুই দিন হাটের মতোই এখানে বেশি পণ্য থাকে, ক্রেতাদের ভিড়ও দেখা যায়। বিক্রয়কেন্দ্রটি অবশ্য খোলা থাকে সাত দিনই।

উদ্যোগটা অনেক দূর এগোলেও এখনো নানা বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে কাকলিকে। বললেন, ‘এই উদ্যোগ একটা সামাজিক আন্দোলন। যেহেতু এখানে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে, সে হিসেবে এটা ব্যবসাও। কৃষক থেকে শুরু করে ভোক্তা—প্রতিটি জায়গায় বাধা। কৃষকেরা সার, কীটনাশকে এতটাই অভ্যস্ত, তাঁরা প্রাকৃতিক ও জৈব পদ্ধতিতে ফিরে আসতে চান না। ভোক্তার মানসিকতাও অনেক জটিল।’

এটি চালিয়ে নিতে এখনো প্রতি মাসে বেশ বড় অঙ্কের টাকা ভর্তুকি দিতে হয় কাকলিকে। টাকার জোগান দেন তাঁর ব্যবসায়ী স্বামী মামুন খান। নিজেও একটা চাকরি করেন। আর্থিকভাবে ক্ষতি, পরিবারকেও যথেষ্ট সময় দিতে পারেন না, তবু কেন এই উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন? ‘এর পেছনে আমার অনেক টাকা খরচ হয়েছে। তবু হাল ছাড়ি না। সন্তানের মতোই কাজটা ভালোবেসে ফেলেছি’—কাকলির চোখে ভেসে ওঠে তাঁর চার বছরের কন্যা জোলেহা খানের ছবি।

নিজের সন্তানকে বড় করতে যত ত্যাগ একজন মাকে স্বীকার করতে হয়, এই উদ্যোগ সফল করতে সেটিই করতে চান কাকলি।

কৃতজ্ঞতা- দৈনিক প্রথম আলো

শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য