রুটির অজানা কথা

প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে মানুষ রুটি খেয়ে আসছে। গম, যব, জোয়ার, বাজরা যে শস্য থেকে যেভাবেই হোক না কেন, রুটি মানুষের আদিমতম এক খাদ্যবস্তু।

পৃথিবীতে প্রথম রুটি তৈরি হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ১২,০০০ বছর আগে। তখন নব্যপ্রস্তর যুগ। মোটা দানার শস্য জলের সঙ্গে মিশিয়ে, ঠেস দিয়ে সেই শস্যের ভিজে তাল তৈরি হয়েছিল। তারপর গরম পাথরের উপর সেই তাল রেখে, উত্তপ্ত ছাই দিয়ে সেঁকা হত। এভাবেই নব্যপ্রস্তর যুগের আদিম মানুষেরা রুটি তৈরি করতে সমর্থ হয়েছিল।

মিশরীয় সভ্যতার মানুষরা আবার এ বিষয়ে একধাপ এগিয়ে গিয়েছিল। তারা দেখেছিল, ‘ইস্ট’ অর্থাৎ খমির দিলে রুটিটা বেশ ফুলে ফেঁপে উঠে। তারা আরও খেয়াল করেছিল, রুটি তৈরির শ্রেষ্ঠ উপাদান হল গম। যদিও জোয়ার, বাজরা, ভুট্টা এসব শস্য দিয়েও রুটি তৈরি করা যায়। রুটি তৈরির এই আদিম মিশরীয় পদ্ধতিটি বেশ সহজ-সরল। গম কিংবা অন্যান্য শস্য পিষে আটা তৈরি করা হয়। তারপর এটাকে জলে ভিজিয়ে, খমির দিয়ে হাতে ঠাসতে ঠাসতে, মাখতে মাখতে নরম তাল তৈরি হয়। তালের অভ্যন্তরীণ কার্বোহাইড্রেট খমিরে জারিত হয়ে কার্বনডাইঅক্সাইডের বুদবুদ তৈরি করে। এর ফলে, এই আটা বা ময়দার তালটা দিব্যি ফুলে ফেঁপে উঠে। শেষে গরম উনুনে ওই রুটি সেঁকা হয়। মিশরীয় সভ্যতার লোকেরা এইভাবেই প্রথম হালকা, ফাঁপা ও ফুলকো ফুলকো সুস্বাদু রুটি তৈরি করেছিল। ঐতিহাসিকদের অনুমান, রুটি সেঁকার জন্য উনুন বা ‘বেকিং আভেন’ ও প্রথম ওই মিশরীয়রা আবিষ্কার করেছিল। হাতে গড়া চ্যাপ্টা রুটিও বেশ প্রাচীন। সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও আফ্রিকা জুড়ে এই জাতীয় রুটির প্রচলন আছে।

‘চাপাটি’ নামে একধরনের রুটি ভারতে বেশ জনপ্রিয়। লাতিন আমেরিকায় ভুট্টা থেকে একজাতীয় ছোট ছোট কেক তৈরি করা হয়, এর নাম ‘টরটিলা’। ব্রাজিলে ‘কাসাভা’ নামে একপ্রকার কন্দ চাষ করা হয়, ওই কাসাভা থেকেই সেখানে রুটি ও কেক তৈরি করা হয়।

রুটি সাধারণত ওজন দরে বিক্রি করা হয়। ব্রিটেন ও অন্য বহু দেশে সরকারিভাবে রুটির দাম বেঁধে দেয়া হয়। রুটিতে উপাদান হিসেবে কী শস্য ব্যবহার করা যাবে, তাও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। সাধারণত যেদিন উনুনে সেঁকা হয়, সেদিনই রুটি বিক্রি করা উচিত। রুটিতে বেশ তাড়াতাড়ি পচন ধরে।

যুক্তরাজ্যে বেশিরভাগ রুটিই ময়দার তৈরি। সেখানে প্রায়ই টিনে ভরে রুটি সেঁকা হয়। যুক্তরাজ্যে কোনও পাউরুটির নাম ‘সপ্লিট টিন’ (ফাটা টিন), কোনওটার নাম ‘টিন টুইস্ট’ (জড়ানো টিন)। নামের মধ্যেই এইসব রুটি বানানোর পদ্ধতি পরিচয় লুকিয়ে আছে। ময়দাতে প্রায় ৮০ থেকে ৯৫ শতাংশ আসল গমের আটা থাকে, এতে বাদামি রুটি বানানো যায়। উৎসব অনুষ্ঠান উপলক্ষে মজার মজার অনেক সুস্বাদু রুটি তৈরি হয়। তৈরি হয় ‘ফ্রুট ব্রেড’ অথবা ‘মিষ্টি রুটি’। আইরিশ বার্মব্র্যাক কিংবা লিঙ্কনশায়ার প্লাম ব্রেড এই জাতীয় পৃথিবীখ্যাত মিষ্টি রুটির উদাহরণ। রা ইবা যব দিয়ে তৈরি হয় জার্মানির বিখ্যাত কালো রঙের রুটি ‘পামপারনিকেল’। গোল গোল ‘পিত্তা রুটি’ মধ্যপ্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরের অন্যতম আকর্ষণ। ফ্রান্সে বেড়াতে গিয়ে অন্যতম উপভোগ্য জিনিস হল, সাতসকালে কোনও রুটির দোকানে গিয়ে লাইন দেওয়া, তারপর প্রাতরাশের জন্য হাতভর্তি ‘বাগেত’ কিনে বাড়ি ফেরা।

প্রাচ্যের নানা অঞ্চলের অধিবাসীরা অবশ্য গম বা আটার রুটির বদলে ভাত খেতে ভালবাসেন। কিন্তু এই শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে সারা পৃথিবীতেই এখন রুটি ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

ভারতে হাতে গড়া চ্যাপ্টা, গোলাকার ইত্যাদি হরেক আকারের নানারকম রুটি তৈরি হয়। চাপাটি, পরোটা, নান ইত্যাদি বহু পদ্ধতিতে তৈরি রুটিই ভারতে জনপ্রিয়। আমেরিকার দক্ষিণের প্রদেশগুলিতে এখনও প্রাতরাশে গরম গরম রুটি পরিবেশন করা হয়। ভুট্টার তৈরি এইসব রুটির কোনওটার নাম ‘বাকহুইট’, কোনওটার নাম ‘হোমিনি’, কোনওটার নাম আবার ‘জনি কেক’।

শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য