চিনির পেছনের করুণ ইতিহাস

মানুষের আনন্দের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যাওয়া চিনির ইতিহাস কিন্তু ততোটা হাস্যোজ্জ্বল ছিলো না। বরং এই চিনির সাথে আজও লেপ্টে আছে বহু মানুষের রক্ত, ঘাম এবং দীর্ঘশ্বাস।

গল্পটার শুরু ক্রুসেডের সময় হতে। কিংডম অব জেরুজালেমে আগমন ঘটেছিলো উইলিয়াম অব টায়ারের। জেরুজালেম, অ্যান্টিঅকসহ ভূমধ্যসাগরতীরের বেশকিছু শহর যখন ক্রুসেডাররা জয় করে নিলো তারা সেখানে সন্ধান পেয়েছিলো আশ্চর্যজনক এক বিষয়ের। লবন এবং সাদা পাউডারের মত দেখতে কিছু একটা খুঁজে পেয়েছিলো তারা। অদ্ভূতভাবে তারা লক্ষ করেছিলো লবন নোনতা হলেও এই জিনিসটি খেতে মিষ্টি।

জেরুজালেমে উৎপন্ন হলেও শতবছরের ইতিহাসে ইউরোপীয়ানরা কিন্তু এর খোঁজ পায়নি। ক্রমেই পণ্যটির গ্রহণযোগ্যতা ইউরোপীয়ানদের মাঝে এতোটাই বাড়তে ‍শুরু করে যে বর্তমান যুগের কোটি টাকার হীরার মতোই বিলাসী পণ্যের কাতারে পড়তে শুরু করে চিনি। এর কারণও অবশ্য প্রচুর ছিলো। চিনি উৎপাদন বর্তমান যুগের মতো এতোটা হাতের নাগালে ছিলো না। প্রচুর টাকা ব্যয় করা লাগতো এটি উৎপাদনের পেছনে। পরিশ্রমও হতো অমানুষিক হারে। স্বভাবতই কোনো স্বাধীন নাগরিক এতোটা অমানুষিক পরিশ্রমে রাজি হতো না। ব্যস, ‍শুরু হয়ে গেলো দাসদের কাজে লাগানো। যার প্রথম ধাক্কাটা যায় আফ্রো-মুসলিম দাসদের উপর দিয়ে। এরপরই তারা বিশালদেহী রাশিয়ান বন্দীদের কাজে লাগানো শুরু করলো। সেখানেও বিপত্তি পিছ ছাড়েনি ইউরোপীয়ানদের। ঠান্ডা জলবায়ুতে জন্মানো রাশিয়ানরাও বেশিদিন এই কাজে টিকে থাকতে পারেনি।

১১৭১ হতে ১১৯৩ এর মাঝেই ক্রুসেড বাহিনী বিখ্যাত মুসলিম বিজেতা সালাহউদ্দিন আল আইয়ুবির কাছে হারিয়ে ফেলে ফিলিস্তিনের বেশ অনেকখানি ভূখন্ড। এরপর একের পর এক রুকনুদ্দিন বাইবারস, সুলতান আল মানসুর কালাউনের মতো আইয়ুবির কিছু অনুসারীরা পরবর্তী ১০০ বছরের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য হতে ক্রুসেডারদের নাম ও নিশানা একেবারে মিটিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ইউরোপীয়ানদের চিনির স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলেও চিনির স্বাদ কিন্তু তারা ভুলতে পারে নি।

এরপর হতে পর্তুগিজরা আটলান্টিক চষে ফেলতে শুরু করেন। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষের দিকে নানা সংঘাতের পর তাদের হাতে রসালো ও উর্বর জমিগুলো চলে আসতে শুরু করে যাতে তারা আখ চাষ করতে পারে। দ্বীপগুলো দখল করেই প্রথম সুযোগে তারা ইউরোপ ও রাশিয়া হতে শক্তপোক্ত মানুষদের ধরে নিয়ে আসে এবং শুরু করে দেয় আখ উৎপাদন।

পৃথিবীর আদিমতম নেশা হলো গ্লুকোজের নেশা। আর চিনি হতে ইউরোপীয়ানরা সরাসরি তাই পেতে থাকে। ক্রুসেডারদের মারফত বাজারে আসা এই চিনি বাজারে একচেটিয়া প্রাধান্য বিস্তার শুরু করলো। ইউরোপীয় সমাজে এটি আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে যেতে লাগলো। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিলো, যে যত বেশি চিনি খায় সে তত বেশি বড়লোক। অন্যের চেয়ে আমি বেশি টাকার মালিক এটা বুঝাতে গিয়ে চিনি বিষয়টা এমন মহামারী আকার ধারণ করেছিলো যে ১২৮৮ সালে শুধু ব্রিটিশ রাজপরিবারের খাবারের জন্যই চিনি দরকার হয়েছিলো ৬০০০ পাউন্ড। অতিরিক্ত চিনি খাওয়ায় রানি প্রথম এলিজাবেথের সব দাঁত কালো হয়ে গিয়েছিলো। কালো দাঁত এবং চিনি নিয়ে ব্রিটিশদের পাগলামি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিলো যে, কালো দাঁতকে মনে করা হতে আভিজাত্যের শ্রেষ্ঠ প্রতীক। সবাই চিনি খেতে চাইলেও চিনির যোগান কম হওয়ায় সাধ্যে কুলাতো শুধু উচ্চবিত্তদেরই। এমন অবস্থায় মধ্যবিত্তরাও পিছিয়ে থাকেন নি। তারা নিজেদের দাঁতে কয়লা ঘষে দাঁত কালো করতে শুরু করে এটা বুঝানোর জন্যই যে তাদেরও প্রচুর টাকা আছে; তারাও চিনি খেয়ে দাঁত কালো করে ফেলছে।

এরই মধ্যে কলম্বাস আমেরিকার মাটিতে পা দিয়ে ফেলেছিলেন এবং পৌঁছে গিয়েছিলেন ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুন্জ বিশেষ করে কিউবান অঞ্চলে। সেখানে পা দিয়েই সেখানের পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে ভাবা হতে থাকে আখ চাষের সম্ভাব্যতা। তার দ্বিতীয় সমুদ্রযাত্রার সাথে সাথেই ক্যারিবিয়ান দ্বীপগুলোতে শুরু হয়ে গিয়েছিলো চিনি চাষ। কিন্তু এই ভ্রান্তি কাটতেও বেশিদিন লাগেনি ব্রিটিশদের। তারা উপলব্ধি করে আখ চাষের জন্য যে অমানবিক পরিশ্রম দরকার তার তুলনায় আমেরিকানরা বেশ দুর্বল।

১৬৮৩ সালে সেকেন্ড ব্যাটেল অব ভিয়েনায় ওসমানী সাম্রাজ্যের কোমড় ভেঙ্গে গেলে গণহারে আফ্রিকান বিশালদেহী মানুষগুলোকে দাস বানিয়ে নিয়ে আসা হয় ক্যারিবিয়ান দ্বীপগুলোতে। ব্রিস্টল, লন্ডন, ম্যানচেস্টারের তথাকথিত সভ্য মানুষরাই তলোয়ার, বন্দুক, কামান, ছুরি নিয়ে নামত আর ধরে নিয়ে আসত পালে পালে মানুষ। আফ্রিকার সুজলা দেশের যে গ্রামেই ঢুকতো এই দাস শিকারীরা সেই গ্রামকেই মৃত্যুপুরী বানিয়ে ফেলতো তারা। ঐতিহাসিকদের মতে, ১৫০০-১৯০০ এই ৪০০ বছরে ব্রিটিশরা প্রায় ২ লক্ষ ৬০ কোটি মানুষকে দাস হিসেবে আমেরিকায় পাচার করেছিলো, যাদের আয়ত্বে আনার জন্য হত্যা করা হয়েছিলো আরও কয়েক কোটি মানুষ। শতবছরের দাসত্বের ইতিহাসে আখ, কফি আর তামাক চাষ ছাড়া আর কিছুই শেখানো হয়নি এই দাসদের।

দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়েও তারা চিনির এই গোলকধাঁধা থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। বছরের পর বছর হাজারও অত্যাচার, প্রিয়জনদের রক্ত আর অগণিত দীর্ঘশ্বাসের সাথেই সহস্র সাধারণ মানুষ চিনিকলগুলোতে অমানুষিক পরিশ্রম করে যেতো। যাদের কাঁধে চড়েই আজকের আমেরিকা বা ব্রিটিশরা এতোটা ধনী রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। চিনির সাদা চেহারা দেখে আমাদের হৃদয়ে কখনোই এই রক্তাক্ত ইতিহাস ভেসে না ‍উঠলেও অষ্টাদশ শতাব্দীর মানুষের কাছে এই চিনি ছিলো জীবনমরণের প্রশ্ন।

শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য