
শহরের ঠিক মাথার ওপর এর অবস্থান। ব্যস্ততম বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়কের পাশে, সাঙ্গু নদীর তীরে। প্রতিদিন ফেলে দেওয়া এসব ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে চলাচলের রাস্তায়। দুর্গন্ধে এর পাশ দিয়ে সাধারণ মানুষের হাঁটাচলারও দায়। পচা-দুর্গন্ধের কারণে নিজেদের বাড়িতেই থাকতে পারেন না আশপাশের এলাকার মানুষ। তবে শুধু পৌরসভার নয়, হাসপাতালের বর্জ্যগুলোও ফেলা হচ্ছে এখানে।
ফেলে দেওয়ার পর এসব ময়লা-আর্বজনায় আগুন ধরানো হয়। এরপর সেখান থেকে সারাদিন ধোঁয়া বের হতে থাকে। আবর্জনার দুর্গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। তার পাশাপাশি ফেলে দেওয়ার এসব আবর্জনা নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ে সাঙ্গু নদীতে। ফলে একদিকে সৃষ্টি হচ্ছে নদীর দূষণ, অন্যদিকে নদীর পানি ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন স্থানীয়রা।
১৯৮৪ সালে বান্দরবান সদর প্রথম পৌরসভা গঠন করা হয়েছে। শুরুর দিকে তৃতীয় শ্রেণী হলেও ২০০১ সালে এসে প্রথম শ্রেণীতে উন্নীত হয়। কিন্তু এত বছর পরও এখনও পর্যন্ত কোন সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেনি। পৌর বর্জ্য ব্যবস্থপনার সেবার মানে এখনও তৃতীয় পর্যায়ে রয়েছে।

আবর্জনা ছড়িয়ে থাকে সড়কে
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শহরে রোয়াংছড়ি বাস ষ্টেশনের সামান্য দূরে গেলে পাহাড়ের উপরে লেমুঝিড়ি আগা পাড়া। যেখানে মারমা সম্প্রদায়ের শতাধিক পরিবার বসবাস করে। পাড়া থেকে একটু সামনেই গেলেই সড়কের পাশে পৌরসভার আবর্জনার ফেলার জায়গা। এই সড়কের একপাশে লেমুঝিরি আগা পাড়া। আরেক পাশে সাঙ্গুী নদী। এখানে এসে প্রতিদিন পৌরসভার ট্রাক ও ছোট ভ্যানে করে ফেলা হচ্ছে শহরে যাবতীয় ময়লা-আর্বজনা।
ফেলা দেওয়ার এসব আর্বজনা সবসময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে সড়কের উপর। আবার পড়ে থাকা এসব ময়লা-আর্বজনার পথ মাড়িয়ে বাধ্য হয়ে চলাচল করতে হচ্ছে স্থানীয়দের। কারণ এই পথ দিয়ে যেতে হয় রোয়াংছড়ি উপজেলা এবং কালাঘাটা এলাকায়। এছাড়া প্রতিদিন চলাচলে রয়েছে শত শত মোটর সাইকেল, সিএনজি ও বাসসহ অন্যান্য যাত্রীবাহী গাড়ি।
লেমুঝিরির বাসিন্দা মংচ মারমা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, পাড়ার পাশেই পৗরসভার আবর্জনার স্তুপ। পচা-দুর্গন্ধে বাড়িতেই থাকা যায় না। এখানে ময়লা ফেলা হচ্ছে অনেক বছর ধরে। শহর হওয়ার পর থেকে পৌর এলাকায় যত ময়লা-আর্বজনা রয়েছে সেগুলো এখানে এসে ফেলা হয়। একদিকে সেখান থেকে সারাদিন ধোঁয়া বের হয়। আরেক দিকে পচা-দুর্গন্ধ নাকে এসে লাগে।
‘‘পৌর কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে জায়গা পরিবর্তন করার জন্য। কিন্তু এত বছর পরেও কোন পরিবর্তন নেই। এই রাস্তা দিয়ে পথচারী মানুষ কম চলাচল করে। কিন্তু গাড়ি চলাচল বেশি রয়েছে। বিকেলে স্থানীয় কিছু মানুষ ভ্রমনে বের হয়। তাদের অনেকেই নাক-মুখ চেপে চলাচল করতে দেখা যায়। দূরে একটি সুনির্দিষ্ট জায়গায় ময়লা-আবর্জনা ফেলার ব্যবস্থা করলে সবার উপকার হবে।’’
শহরে উজানি পাড়ার বাসিন্দা সাচশৈ মারমা বলেন, “অনেক বছর আগে শহরে লোকজন কম ছিল। তখন এত এবড়োথেবড়ো অলিগলিও হয়নি। শহরে কিছু ময়লা-আর্বজনা রোয়াংছড়ি বাস ষ্টেশন পাহাড়ের উপর লেমুঝিরি পাড়ার সামনে গিয়ে ফেলা হত। ময়লা কম হওয়ায় এত তীব্র গন্ধও ছড়াত না। এখন রীতিমতো শহর হয়ে গেছে।
দিন দিন লোকজন বাড়ছে। ময়লা-আবর্জনাও বাড়ছে। সড়কের পাশে যখন ময়লা ফেলা হয় যত্ন করেও ফেলাও হচ্ছে না। কোনরকমে গাড়ি থেকে ফেলে দিয়ে আসে। ফলে আর্বজনাগুলো যত্রতত্র সড়কের উপর ছড়িয়ে পড়ে। দূরে গিয়ে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলা হলে আরও পরিচ্ছন্ন এবং দূষণমুক্ত থাকা যেত।’’
মো. জিসান নামে শহরে এক বাসিন্দা জানান, “অনেক বছর ধরে পৌরসভার ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে এখানে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ময়লা দুর্গন্ধে স্বাভাবিক হাঁটাচলা করতেও পারছেন না সাধারণ মানুষ। ময়লা-আবর্জনা ফেলা দেওয়া এই পাহাড়ে নিচের একপাশে রয়েছে সাঙ্গু নদী। যেখানে কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে অনেকেই সাংসারিক কাজে ব্যবহার করে থাকেন। তাদের অনেকেই স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়বে।”

বেকায়দায় প্রাত:ভ্রমণের মানুষ
প্রতিদিন সকাল হলে প্রাত:ভ্রমণে বের হন শহরে স্বাস্থ্যসচেতন কিছু মানুষ। আবার কিছু মানুষ বের হন বৈকালিক ভ্রমনে। শহরে ট্রাফিক মোড় থেকে রোয়াংছড়ি বাস স্টেশনের উপরে ময়লা-আবর্জনা ফেলার এই সড়ক ধরে কালাঘাটা হয়ে আবার শহরে আসতে হয় তাদেরকে। আবার অনেকেই নিউগুলশান ব্রীজ থেকে কালাঘাটা পার হয়ে ময়লা-আবর্জনার পথ ধরেই শহরে আসে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে রোয়াংছড়ি বাস ষ্টেশনের উপরে ময়লা-আর্বজনার দুর্গন্ধের কারনে এভাবে কেউ ভ্রমণে বের হন না। ঘুরেফিরে শহরে মধ্যে প্রাত:ভ্রমণ করে থাকেন তারা।
তেমনই একজন জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অংচমং মারমা। তাঁর মতে, “শহর এলাকা হলেও ভোর সকালের পরিবেশ সবসময় দুষণমুক্ত। কোথাও ধুলোবালি নেই। কোথাও কোন গাড়ির শব্দ নেই। এরকম সুন্দর পরিবেশের জন্য অনেকেই প্রাত;ভ্রমণে বের হয়। কিন্তু সাতসকালে বের হয়ে যদি ময়লা-আর্বজনার গন্ধ নাকে এসে লাগে তাহলে তো ভাল লাগবে না। এজন্য আবর্জনার পয়েন্ট পর্যন্ত কেউ যায় না। কাছাকাছি গিয়ে ফিরে আসে।”
বান্দরবান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক বাওয়াই মারমা বলেন, “শুক্রবার ও শনিবার ছাড়া প্রাত;ভ্রমণে যাওয়ার সুযোগ হয় না। কিন্তু স্কুল ছুটির পর বিকেল বেলায় মাঝে মাঝে বৈকালিক ভ্রমণে বের হই। লেমুঝিরি ময়লা-আবর্জনার পয়েন্টটা খুবই বিরক্তিকর। এগুলো সড়ক থেকে সামান্য দূরে ফেলার কথা। কিন্তু সবসময় দেখি ময়লাগুলো একদম সড়কে উপর পড়ে থাকে। পার হওয়ার সময় নাক-মুখ চেপে পার হতে হয়।

পৌরসভার ময়লা কেন সড়কের উপর
বড় ট্রাকে করে আবর্জনা ফেলতে আসা রফিক উদ্দিন নামে পৌরসভার গাড়ি চালক জানান, পৌরসভার বিভিন্ন পয়েন্টে ময়লা-আবর্জনা যখন জমা হয় সেগুলো গিয়ে গিয়ে সংগ্রহ করা হয়। দিনে কখনও তিন বার, কখনও চার বার করে ফেলতে হয়। কোনো কোনো ওয়ার্ডে ময়লা-আবর্জনা কম জমে। বড় ট্রাক লাগে না। তখন ছোট গাড়িতে করে নিয়ে আসা হয়। আমরা সড়কের পাশে নির্ধারিত জায়গায় ময়লা ফেলি। কিন্তু পরে কুকুর-গরু এসে এলোমেলো করে দেয়। তখন সড়কের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়।
পৌরসভার ময়লা-আবর্জনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা কঞ্জারভেন্সি সুপারভাইজার দিদারুল হক চৌধুরী বলেন, কোন জায়গা থেকে দিনের ময়লা দিনে গিয়ে নিয়ে আসা হয়। কোনো জায়গা ময়লা জমানোর এক-দুই দিন পর সংগ্রহ করা হয়। পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় মোট ১০২ জন লোকবল রয়েছে। তার মধ্যে ৬০ জন মহিলা ঝাড়ুদার এবং ৪২ জন পুরুষ ঝাড়ুদার। তবে আরও ২০ জনের মত মহিলা ঝাড়ুদার এবং ১৫ জনের মত পুরুষ ঝাড়ুদার দরকার। তিন বছর আগে এডিবি থেকে একটি প্রতিনিধি দল ডাম্পিং ষ্টেশনের জন্য পরিদর্শণ করতে আসছিল। এরপর থেকে আর কোন খবর নেই। এগুলো কর্মকতারাই ভাল বলতে পারবে।
ভূমি জটিলতায় ‘ডাম্পিং ষ্টেশন’
স্থানীয়রা বলছেন, নদীর সাথে সম্পর্ক আছে এমন জায়গায় বর্জ্য ফেলা সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা হতে পারে না। ময়লা-আবর্জনা নদীতে পড়ে দুষিত পানি ব্যবহারের ফলে একসময় মহামারি আকারে রোগ ছড়াতেও পারে। দুর্গন্ধ বাতাসে মিশে মানবদেহে প্রবেশ করছে। যত দ্রুত সম্ভব ভূমি জটিলতা দূর করে এসব ময়লা-আবর্জনা ফেলার স্থান পৌর এলাকার বাইরে অন্য কোথাও নির্ধারিত জায়গায় ফেলা উচিত।
যাতে চারদিকে সীমানা দেয়াল দেওয়া থাকে। যেখানে ময়লা-আবর্জনা অন্য কোথাও ছড়িয়ে যাবে না। শহর থেকে দূরে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ময়লা-আবর্জনা ফেলার স্থান তৈরি করতে পারলে নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি হবে এবং নদী দূষণ থেকেও রক্ষা পাবে। এর ফলে সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ফিরে পাবে সাধারণ মানুষ।
এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে বান্দরবান পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা করুনাময় কান্তি বড়ুয়া বলেন, নথিপত্রে দেখলাম বর্তমানে যেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে তার একটু দূরে প্রায় ৫ একরের মত জায়গায় একটা ডাম্পিং ষ্টেশন করা হবে। যিনি পৌরসভার কর্তৃপক্ষের কাছে ভূমি হস্তান্তর করেছেন তার সঙ্গে কিছু লোকের জমি সংক্রান্ত সমস্যা আছে। মূলত ভূমি জটিলতার কারনে আটকে আছে। এ সমস্যা মিটে গেলে ময়লা-আবর্জনা ফেলার আর কোন ঝামেলা থাকবে না।
‘‘সড়কের পাশে যেদিকে সাঙ্গু নদী পড়েছে সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা এমনিতে নিষেধ। তারপরও অনেকেই না জেনে ফেলে দিয়ে যায়। যার কারনে সাঙ্গু নদীর পাশে ময়লা-আবর্জনা না ফেলার জন্য এখন থেকে একটা সাইবোর্ড টাঙ্গানো হবে।’’
পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও বান্দরবান সদর পৌর প্রশাসক এস এম মনজুরুল হক বলেন, ভূমি অধিগ্রহণের কাজ এখন একেবারেই শেষ পর্যায়ে। শুধু ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়টা আছে। বাকি সকল কাজ সম্পন্ন হয়েছে। একটা ভাল প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন হতে সময় লাগে। বর্জ্য সমস্যা তো একদিনের না। একটু সময় দিতে হবে।
কারণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পটি উন্নতমানের একটা প্রকল্প হবে। প্রকল্পের মেয়াদ হচ্ছে ২০২৮ সাল পর্যন্ত। তার মেয়াদের মধ্যে শেষ করার টার্গেট রয়েছে। একই সাথে বিশুদ্ধ পানির প্লান্টও হবে। সেটা বালাঘাটা এলাকার বাকীছড়ামুখে হবে। বর্জ্য ও বিশুদ্ধ পানির প্লান্ট- দুটোই একই সাথে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কাজ করবে। এখন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হলে পেমেন্টটা (ভূমি মালিকদের) তাদের কাছে হস্তান্তর করে দেব। হস্তান্তর করার পর তারা তাদের কার্যক্রম শুরু করে দেবে।
এস এম মনজুরুল হক বলেন, এই প্লান্টটা খুবই উন্নতমানের প্লান্ট হবে। এখানে ময়লাকে রিসাইকেল করে ফুুয়েল ও সার তৈরি করা হবে। একটু কষ্ট করতে হবে। পৌরবাসীকে আরেকটু ধৈর্য্য ধরতে হবে। কারন দীর্ঘদিনের একটা সমস্য হঠাৎ করে সমাধান হবে না। বিকল্প ব্যবস্থা না করে বর্তমানে ডাম্পিং ষ্টেশন হঠাৎ কোথায় নিয়ে যাব। আর ময়লা-আর্বজনা রাস্তার উপর যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সেটা বলে দেওয়া হবে।

















