স্বর্গের পরিবেশ নিয়ে আমার ভাবনা

প্রতীকি ছবি
ছবি - ঞ্যো হ্লা মং

পাহাড়ে ছোটখাট কিছু পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে। যেমন আমাদের ছেলেবেলায় দেখেছি বিহারে বেঁচে যাওয়া খাবার খেলে সমাজে নানা কথা শুনতে হতো। বন্ধুদের মধ্যে দুষ্টুমির ছলে একে অপরকে বলতো ‘ক্যং খুই’। সমাজে বিহারের খাবার খাওয়া লোকজনকে বুঝাতে ‘ক্যং খুই’ শব্দদ্বয় ব্যবহার করতো। এখন আগের যে কোন সময়ের তুলনায় খাবার অপচয় কমেছে। বিহারে বেঁচে যাওয়া খাবার খেতে অনেক দায়ক দায়িকা খুব একটা সংকোচবোধ করেন না আর।

বিহার দর্শনে যাওয়া অনেকে বিহারের খাবার খায়। এটি আমার ভাল লাগে। অন্ততপক্ষে লোকজন আগের মতো বিহারের খাবার বলে ফেলে দেয় না। আরো একটি ভাল দিক আছে, তা হলো পালাক্রমে বিহারে পিন্ডদান। আগে যে যার মতো পিন্ডদানে যেতো। কোনদিন বেশি হতো আর কোন কোন দিন হয়তো প্রয়োজনের তুলনায় কম। এখন বিহারে বিহারে রুটিন করে পিন্ডদান হয়। বিল্ডিংওয়ালা আর শনঘরওয়ালা সকলের সুযোগ হয় ভিক্ষু সেবা করার।

ছেলেবেলায় দেখা বিহারগুলো ছিল বিশাল বিশাল গাছ আর বাছাই করা পরিপক্ক কাঠ দিয়ে নির্মিত। এক কথায়, এলাকার সেরা গাছ, সেরা কাঠ দিয়েই নির্মিত হতো। প্রায় সবক’টি বিহারে উঠতে মোটা গাছের গুঁড়ি বা সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠতে হতো। বিহার এলাকা মানে ঘন বাগান, নিরিবিলি জায়গা। সন্ধ্যার আগে বিহারে লোক দেখাই যেতো না। সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত থাকতো।

ব্যতিক্রম ছাড়া এক পাড়ায় একটি বিহারই ছিল। নিরিবিলি গাছ-বাঁশ, ফল বাগান ঘেরা মোটা লম্বা লম্বা গাছ আর কাঠ দিয়ে নির্মিত বিহারগুলো কিভাবে কিভাবে যেন হারিয়ে সব দালান কোঠা আর চাকচিক্যে ভরে গেলো।

আমার দাদা-দাদীদের সময়ে বিহার শুধু প্রার্থণা ঘর ছিল না। পশু-পাখিদের আশ্রয়স্থলও ছিল। বিহার প্রাঙ্গণ জুড়ে থাকতো নানা প্রজাতির গাছপালা। এখন পাহাড়ে বিহারগুলোতে পশুপাখি বলতে শুধু কাক আর কুকুরের সংখ্যাই বৃদ্ধি পেয়েছে। চারিদিকে বিহারের সংখ্যা বাড়লেও গাছপালা বাড়েনি। আর পাখিদের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠেনি। কিছু বিহারে বানরের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেলেও পাহাড়ে বিরল পাখিগুলোর আশ্রয়-প্রশ্রয়ের তালিকায় নেই। খাগড়াছড়ি সদর নিউজিল্যান্ড এলাকাকে ঘিরে বেশ কয়েকটি বিহার আছে। প্রতিবছর ধান কাটা হয়ে গেলে এই ধানক্ষেত হয়ে ওঠে ঘুঘু শিকারীদের অভয়ারণ্য। গত বছর এক ঘুঘু শিকারীর সাথে কথা হয়। সে প্রতিদিন কমবেশি ১০ জোড়া ঘুঘু শিকার করে। জোড়া প্রতি ৩০০ টাকা দরে বিক্রি করে।

পাহাড়ে নিত্যদিন তরুণদের দল বিহারে যাওয়ার ছবি ফেসবুকে পোষ্ট করে। প্রায় প্রতিটি গানে বিহারে যাওয়ার কথা থাকে। প্রেমিক প্রেমিকা বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে মোম জ্বালানোর দৃশ্য পাহাড়ের গানগুলোর একটি অতি পরিচিত দৃশ্য। ঘুঘু শিকারীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেউ নিষেধ করে না?। বলে, ‘না’। সবাই কেনার জন্য পাগল। ধরা পড়ার অপেক্ষায় থাকে। চারিদিকে এত ধার্মিক। বাজারে গেলেও মরা মাছ, কাটা মুরগী মাংস ছাড়া কেনার লোক দেখা যায় না। চারিদিকে সুন্দর সুন্দর বিহার হলেও কেউ এ নিরীহ ঘুঘুগুলোকে শিকার না করতে উদ্যোগ নেয় না। প্রশ্ন জাগে, কেন শিকারীকে পুনর্বাসনের জন্য ধর্মপ্রাণ দায়ক-দায়িকা, বিহারগুলো দায়িত্ব নেয় না?

নিরীহ ঘুঘু পাখির বংশধর বিনাশ হচ্ছে, দেখেও না দেখার ভান করে থাকি। আমি বুঝতে পারি ধর্ম থাকে শুধু বিহারে, ধর্ম হয় শুধু বিহারে, বিহারের বাইরে, মন্দিরের বাইরে কোন কাজকে ধর্ম বলে লিপিবদ্ধ করি না আমাদের সমাজে, এই সময়ে। তাই সবাই বিহারকে ধর্ম মানে। সমাজে স্বজাতির আত্নীয়-স্বজনকে ভাল কাজে উৎসাহিত করাকে, পড়ালেখায় হাত বাড়ানোকে ধর্ম বলে বর্তমান ধর্মে স্থান পায় না। তাই পাহাড় থেকে বিকেএসপিতে চান্স পাওয়া এক ছাত্রের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে হয় সুদূর আমেরিকা থেকে।

বিহারই ধর্ম বলে, বিহারই বাড়ে, সংখ্যায় বাড়ে, আকারে আকৃতিতেও বাড়ে। সৌন্দর্যও বাড়ে, দর্শনার্থীও বাড়ে। আমাদের দাদা-দাদীদের সময়ে এক পাড়াতে একটি বৌদ্ধ বিহারই ছিল। এখন এক একটি পাড়ায় একাধিক বৌদ্ধ বিহার হয়েছে। আমাদের পাড়ায় চাকমা মারমা মিলে একসাথে বসে ধর্মকর্ম করতে দেখেছি, বর্তমানে চাকমাদের জন্যও নতুন একটা বিহার হয়েছে। সুন্দর উদাহরণ হতে পারে পানখাইয়া পাড়া। মারমাদের জন্য আছে ২টি। তার পাশে মিলনপুর বৌদ্ধ বিহার, আছে মধুপুর বিহার ও কল্যাণপুর বিহার। কয়েক ঘর বাড়লেই আমাদের বিহারও বাড়ে। একসাথে একই বিহারে ধর্মকর্ম শেষ বার দেখেছিলাম দাদা-দাদীদের সময়ে।

এখন একসাথে যে হয় না তা নয়। হয়। বড় বড় বিহারে বড় বড় পূণ্য লাভের আশায় একসাথে মিলিত হয়। ছোট ছোট পাড়ায় একসাথে ধর্ম-কর্ম এখন অতীত।

বিহার বেড়েছে। শিক্ষিত দূরদর্শিতাসম্পন্ন ভিক্ষু বেড়েছে কিনা আমার কাছে কোন তথ্য নেই। দাদুদের আমলে ভিক্ষুদের প্রশ্ন করা যেতো। এখন কদাচিৎ ভিক্ষুদের সাথে ধর্মীয় সভায় প্রশ্নোত্তর পর্ব চলে। এখন সম্পূর্ণ একমুখী। ভিক্ষুরা বলবেন, দায়ক-দায়িকারা শুনবেন আর সাধু সাধু বলে মঙ্গল কামনা করবেন। দেশনা কেমন হলো, এই নিয়ে আলোচনা হয় না।

গ্রামে কিছু ভিক্ষুর দেশনা শুনার সুযোগ হয়েছে। এক ভিক্ষুর দেশনায় বললেন “দান-দক্ষিণা থাকতে হবে। দান-দক্ষিণা ছিল বলেই অমুক বাবু চেয়ারম্যান। এখন গাড়ি, বাড়ি করতে পেরেছে। যা ইচ্ছা দান করতে পারছে। এটাকে বলে পারমি”। আমরা জানি এখনকার স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে একজন চেয়ারম্যান কিভাবে হতে হয় এবং কারা হন। গ্রামে গেলে দেখি, আমার মা’র মতো বয়স্ক নারীরা কম ঘুমিয়ে ধর্মীয় গুরুর সেবার জন্য ভোরে উঠে রান্নায় বসে যান।

আমরা সবাই বিহারমুখী হয়ে উঠেছি। বিহারগুলো আমাদেরমুখী হয়ে উঠেনি। আমরা সকলে বিহারের সমস্যা সমাধানে তৎপর হয়েছি। বিহারগুলো গ্রাম, পরিবার, ব্যক্তির সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেনি। আমাদের বিহারে কোমলপানীয়, জুস, বিস্কুট, জুতা-স্যান্ডেল, ছাতা, মোমের অভাব নেই। অতিরিক্ত অপ্রয়োজনীয়, দেশীয় নিম্নমানের জুসের ন্যায় দান, সব নিকটবর্তী দোকানে যায়। দোকান থেকে আবার একই দানীয় দ্রব্যাদি বিহারে প্রবেশ করে। তারপরও গ্রামে কষ্টে থাকা বিধবা নারীটির কাছে যায় না। কষ্টে থাকা দম্পতির কাছে চাল, লবণ, মরিচ যায় না। চাল, ডজনকে ডজন কোকের বোতল, জুসের বোতল গ্রামের ছেলেদের হাত দিয়ে বাজারে কিংবা বিহারের পাশের দোকানে কিংবা গ্রামের কোন গরিব ক্রেতার কাছে যায়। অতিরিক্ত অপ্রয়োজনীয় দানীয় দ্রব্যাদি বিনামূল্যে গরীব মানুষটির কাছে যায় না।

আমাদের দানীয় বস্তুতে নিত্যদিনের চমক দেখা যায়। আগে সেভেন আপ, কোকাকোলা পর্যন্ত যেতো আর এখন এক ধাপ এগিয়ে এনার্জি ড্রিংক, স্পিড, টাইগার, সিগারেট ইত্যাদিও যুক্ত হয়েছে। আমরা আমাদের দানীয় দ্রব্যের মধ্যে কোমলপানীয় কিংবা স্পিড- এর বদলে ডাবের পানি যুক্ত করতে পারিনি।

পাহাড়ে পাড়ায় পাড়ায় শুধু একাধিক বিহার হয়নি, আমরা ভাগও করতে শিখেছি। উত্তর পাড়া বিহারের লোক, পূর্ব পাড়া বিহারের লোক, অমুক ভান্তের অনুসারী ইত্যাদি। আগে আমাদের দাদুদের আমলে বিহার ছিল মিলনকেন্দ্র। এক বিহারকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা হতো। একই সাথে উঠাবসার সুবাদে মিলমিশ ছিল। এখন বিহার বেড়ে নেতাও বেড়েছে। ধর্মীয় সংগঠক, ধর্মীয় জ্ঞানে জ্ঞানীর সংখ্যাও বেড়েছে। শুধু তাই নয় এখন পাড়ার বিহার সংখ্যা বাড়ার পাশাপশি নিজের মতো করে ধর্ম করতে, ধ্যান করতে অবস্থাওয়ালারা নিজের ঘরের ভিতরে ছোট বড় বুদ্ধ মুর্তি বসিয়ে ‘বুদ্ধ ঘর’ সৃষ্টির ধারা চলছে। এখন পাহাড়ে অবস্থাসম্পন্ন লোকদের বাড়িতে গেলে বিহার নাকি ঘর পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সাথে বুদ্ধ ঘর আর পরিবার মিলেমিশে একাকার।

গৌতম বুদ্ধ মানুষের দুঃখ দুর্দশা বুঝতে এবং মুক্তির উপায় খুঁজতে প্রাসাদ, আরাম আয়েশ ত্যাগ করে বনে গিয়েছিলেন। এখন আমাদের বিহারগুলো আপাতদৃষ্টিতে বাহ্যিক দিক থেকে প্রাসাদে রূপ নিচ্ছে। এসি রুম, বিলাসবহুল গাড়ি, দামি খাবার ইত্যাদির মধ্য দিয়ে। যাদের মাধ্যমে আমরা বুদ্ধের সাক্ষাৎ পেতে, নির্বাণ লাভ করতে, স্বর্গে যেতে চাচ্ছি তাঁরা কি আদৌ প্রস্তুত? জানি না। এত এত মানুষকে যে স্বপ্নের স্বর্গে নিয়ে যেতে হবে, তাতে তাঁরা কি কখনো চাপ অনুভব করেন? আমাদের নিয়ে যেতে তাদেরকে হতে হবে দক্ষ পাইলট। দক্ষতা অর্জনে তাঁরা কি যথেষ্ট পরিশ্রম করছেন? পড়ালেখা, জ্ঞান, দক্ষতা, দূরদৃষ্টিলাভের সাধনাটা করছেন কি?

যুবকরা বিহারে গিয়ে কী কী করা হচ্ছে জানান দিতে সেলফি তোলে। আমাদের চারপাশে কী হচ্ছে সে নিয়ে কি কোন সেলফি আছে? চারপাশে ময়লা আবর্জনা দেখে সবাই এই নরকে থাকবো না বলে স্বর্গের সন্ধানে নেমেছি। স্বর্গে যাওয়ার আগে যতদিন এই ‘নরকভূমিতে’ থাকবো ততদিন সুস্থভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি কি? আমরা সকলে চাইলেই এই নরকভূমিও স্বর্গের পরিবেশ অনুভূতিতে পরিণত করতে পারি।

অস্ট্রেলিয়াতে থাকাকালীন তা আমি কিছুটা অনুভব করেছি। হাইওয়েতে ১০০ কিলোমিটার গতিতে থাকা গাড়িটি দূর্ঘটনায় পড়লে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে পুলিশ এম্বুলেন্স, নার্স এসে হাজির। সঙ্গে সঙ্গে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বিপদের মূহুর্তে সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় সুবিধাদি পেয়ে ভাল অনুভূতি পেয়ে এখনো গভীর ভালবাসা দিয়ে মনে রেখেছি। সেই ভাললাগা অনুভূতিকে আমার জীবনে স্বর্গের অনুভূতির সাথে তুলনা করে থাকি।

দাদা দাদী পাড়ার বিহারকে কেন্দ্র করে চারপাশের গাছগাছালি নিয়ে পশু পাখিদের অভয়ারণ্যে পরিণত করতে নিজেরা পাহারা দিয়ে রাখতেন। লিচু গাছের নিচে বসে পুঁথি পড়তেন। পুঁথি পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়তেন। আমরা তাকে ঘিরে গল্পে বসে যেতাম। আমাদের ঘিরে পশুপাখিদের গান সময়গুলোকে এক স্বর্গের অনুভূতি এনে দিতো। দাদুদের আমলে সেই স্বর্গের স্বাদ পেয়েছি বলে ধানক্ষেতে হাজারো ধার্মিকদের সামনে প্রকাশ্যে ঘুঘু শিকারকে মানতে পারি না। ঘুঘু পাখির শিকার বন্ধ করে গাছের ছায়ায় একদিন দুপুরে পাখিদের ডাক শুনতে শুনতে মাচাং এ হালকা ঝিমিয়ে নিতে পারলে আপনাকেও এক স্বর্গের ভাললাগা অনুভূতি এতে দিতে পারে।

আমার ধারণা স্বর্গ নিশ্চয়ই পরিষ্কার, সাজানো গোছানো হবে। আমরা এখন আছি চারিদিকে ময়লা আবর্জনা, দুর্গন্ধে ভরা এক পৃথিবীতে। আমাদের মৃত্যুর পর যদি অনেকে স্বর্গের স্থানও পায়, টিকতে পারবেন কিনা আমাকে ভাবায়। কেননা, আমরা যারা লক্কর ঝক্কর গাড়িতে চড়ি তারা কিন্তু হঠাৎ করে বিলাসবহুল গাড়িতে চড়তে পারি না। আমাদের অনেককে দেখবেন টাকা থাকলেও বিলাসবহুল গাড়িতে চড়তে পারেন না।

স্বর্গ পেলে টিকে থাকার লক্ষ্যে এখানেও কিছুটা হলেও পৃথিবীকে বসবাসের উপযোগী করতে কাজে হাত থাকা চাই। স্বর্গের পরিবেশে থাকতে এখান থেকেই শুরু করতে হবে। স্বর্গের স্বপ্নের পরিবেশে টিকে থাকতে আমাদের এই পরিবশকেও ভাল রাখতে কাজ থাকা চাই। বিহারের পরিবেশ পুরো সমাজের পরিবেশ নয়। বিহারের সীমানায় ধর্ম শুধু ধর্ম নয়। আমাদের ধর্মের সীমানা হওয়া চাই আকাশের মতো বিশাল। একজন মেথর, পথের ঝাড়ুদারের ভূমিকাকেও দেখতে হবে ধর্মের চশমা দিয়ে। তাদের দুইদিনের অনুপস্থিতি আমাদের জীবনকে নরকে নিয়ে যেতে পারে।

শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য