লিওনার্দোর চিত্রকর্ম ভিট্রুভিয়ান ম্যান: রেনেসাঁর অন্যতম প্রতীক

প্রাচীন গ্রীস ও রোমান দার্শনিকরা বেশ কিছু জটিল গাণিতিক সমস্যা রেখে যান, যার সমাধান বহু বছর পরও বের করা সম্ভব হয়নি। এমনই একটি গাণিতিক সমস্যার নাম Squaring a Circle, অর্থাৎ একটি বৃত্তের ক্ষেত্রফলের সমান করে কিভাবে একটি বর্গক্ষেত্র আঁকানো যায়? একটি বর্গের ক্ষেত্রফল নির্ণয় করা হয় তার এক বাহুর বর্গ করে। আবার বৃত্তের ক্ষেত্রফল নির্ণয় করতে লাগে বৃত্তের ব্যাসার্ধের বর্গের সাথে পাই-এর গুনফল। পাই-এর বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের জন্য ধরেই নেয়া হত এই সমস্যা সমাধান করা অসম্ভব। 

লিওনার্দো দা ভিঞ্চি এই সমস্যার একটি সমাধান বের করলেন। রোমান স্থাপত্যবিদ মার্কাস ভিট্রুভিয়াস ধারণা করতেন, নাভিই মানুষের দেহের কেন্দ্র, অর্থাৎ একটি মানুষের নাভিকে কেন্দ্র ধরে সেই মানবদেহের চারপাশে বৃত্ত আঁকা যাবে । অপর দিকে তিনি এটাও মানতেন, মানুষের বাম হাত থেকে ডান হাত পর্যন্ত দৈর্ঘ্য তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত দুরত্বের সমান। তার মানে দুইহাত প্রসারিত একটি মানুষকে একটি বর্গক্ষেত্রের মধ্যে শতভাগ ঠিকভাবে রাখা যাবে। লিওনার্দো এই দুই ধারণাকে একত্রিত করে এই গাণিতিক সমস্যার সমাধান হিসেবে আঁকলেন তার বিখ্যাত ছবি ভিট্রুভিয়ান ম্যান। 

কিন্তু লিওনার্দোর ভাবনাতে শুধুমাত্র ভিট্রুভিয়াসের এই ধারণাগুলোই ছিলনা। 

তৎকালীন ইটালীতে দার্শনিক আন্দোলন শুরু হয়, যা Neoplatonism নামে পরিচিত। পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের গঠন কেমন হতে পারে, তা নিয়ে চতুর্থ শতাব্দীতে প্লেটো এবং এরিস্টটল দিয়ে যান The Great Chain of Being মতবাদ। এই মতবাদ অনুযায়ী, এই মহাবিশ্ব একটা লম্বা চেইনের মত, যার শুরুর দিকে আছে স্রষ্টা ও দেবতা, তারপর গ্রহ নক্ষত্র আর শেষের দিকে ক্রমান্বয়ে পশুপাখি, কীটপতঙ্গ এবং শয়তান (Devil)। মানবজাতির অবস্থান ধরা হত একবারে মাঝখানে। মানুষের যেমন একটি নশ্বর দেহ আছে, তেমনি আছে অবিনশ্বর আত্মা। একারণে মানব জাতির অবস্থানটা সঠিক হিসেবেই ধরা হত। 

কিন্তু পিকো ডেলা মিরানডোলা ভাবতেন ভিন্নভাবে। তিনি ছিলেন Neoplatonism এর বিপক্ষে। তার মতে, স্রষ্টা চেয়েছিলেন যেন তার অত্যাশ্চার্য সৃষ্টি কেউ অনুধাবন করতে পারে। এর জন্য তিনি মানুষ সৃষ্টি করেন। মানুষ চাইলে যেকোন রূপ ধারণ করতে পারে। তারা চাইলেই পশুর মত হিংস্র ব্যবহার করতে পারে, আবার চাইলেই পারে দেবতাদের মত মহান আচরণ করতে। এটা মানুষের ইচ্ছাধীন। 

লিওনার্দোর ভিট্রুভিয়াস ম্যানের দিকে যদি ফিরে যাওয়া যায়, তাহলে দেখা যাবে, সেখানেও মানুষ সম্পূর্ন ভিন্ন দুইভাবে আচরণ করছে (বৃত্ত এবং বর্গ)। যদি মহাবিশ্ব জ্যামিতিক ভাষায় লেখা হয়েছে হিসেবে ধরা হয়, তাহলে এই ছবির তাৎপর্য হতে পারে যে, আমরা মানুষ মহাবিশ্বের সব অবস্থাতেই টিকে থাকতে পারি। মানুষ চাইলেই জ্যামিতিকভাবে এবং দার্শনিকভাবেও ভিন্ন ভিন্ন আকার ধারণ করে।

তার মানে, একটি ছবিতেই লিওনার্দো জ্যামিতি, দর্শন, ধর্ম, গণিত, স্থাপত্যবিদ্যা এবং সমকালীন চিত্রাংকনের দক্ষতাকে একত্রিত করেছেন। 

আর এভাবেই এই ছবিটি রেনেসাঁর অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে । 

– জেমস আর্ল-এর Lecture থেকে (পরিমার্জিত)

শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য