বনী ইসরাইলের তিনটি কবিতা

ডাকবাক্স

ডাকবাক্সে জমে আছে অনন্ত শূন্যতা
আর লাল রং খয়েরী হয়েছে সেই কবে
জারুল গাছটি পাতা ঝরিয়ে এখন নিঃস্ব
গতবছর তিনটি পাখি জারুলের ডাল থেকে
কয়েকটি পাতা আর ভীষণ রঙিন নয়টি পেখম
পোস্ট করেছিলো ডাকবাক্সে প্রাণবন্ত বিকেলবেলা
ওরা লেখেনি কোন ঠিকানা, প্রাপকের বর্ণনা

তাই অন্তত শূন্যতায় ভরে গ্যাছে ডাকবাক্সের পেট

কোন এক রাতে সংগোপনে কেউ এসে চুরি করবে
খয়েরী মুখো প্রাচীন লোহার শরীরটাকে হুড়মুড়িয়ে
সাথে চলে যাবে কয়েকটি পাতা ও ভীষণ সুন্দর পেখম
শূন্যতার ভেতর মিশে যাওয়া নৈঃশব্দের বাঁকে
একটি অনন্ত শূন্যতার কথা কেউ জানবে না

নোঙর

মাঝে মাঝে ভালো লাগে এই তীব্র আঁধার
চোখ খুলে রাখলেও মনে হয় বন্ধ করে আছি,
অথবা কোনদিনই আলো দেখিনি- চিরকাল অন্ধ।

অন্ধ ভিখারি হয়ে জন্মেছি বেদনার রসে পূর্ণ মাতৃস্তন্যে
হঠাৎ কেউ নোংরা পয়সা ছুঁড়ে দেয় জীবনের পানে,
কুকুরেরা খাবার পৌঁছে দেয় স্বাভাবিক রীতিতে
সংসারের ভার কমে যায় জমকালো পোষাকের অনুপস্থিতিতে।
তবুও সুগন্ধি গায়ে মেখে কেউ পাশ দিয়ে গেলে
জানতে ইচ্ছে করে কি নাম তার, কোন পথে তার ঘর,
কার মৃত্যুর ভয় নিয়ে সে সাঁতার কাটছে পৃথিবীর দীর্ঘ জল!

ভালো লাগে এখন এসব আঁধার
জানি আরো কেউ কেউ আছে আত্মহত্যা করেছে
আলোর ভেতর কুৎসিত জীবনকে ঘৃণা করে
সেই সব পূন্যবান আত্মা ঘিরে আছে আঁধারের টেবিল
এখানে অন্ধেরা দান খেলে আলোর তাস হাতে নিয়ে
জাহাজের শেষ নোঙরের শব্দ স্তব্ধ হলে পরে।

উলঙ্গ হৃদপিণ্ডে

যেখানেই দু’দণ্ড জিরিয়ে নিতে চেয়েছি
ওই তো শূন্যতার সুগন্ধি হুড়মুড়িয়ে
ভারী লোবান হয়ে কামনায় জাপটে ধরেছে,
অবিশ্বাসী নাস্তিকের সংশয় হয়ে ডেকেছে,
গাছের নগ্ন পাতা থেকে অদৃশ্য পাখির শিষ হয়ে বেজেছে,
হাহাকার করেছে রক্ত পলাশের মতো মেঘ কাতর দিনে,
নাম ধরে ডেকেছে গভীর অন্ধকারে অদ্ভুত অশরীরী স্বরে,
বিধবার সাদা শাড়ীর সদ্য জলের গন্ধে,
বিশ্বযুদ্ধের একঘেয়ে দামামার মতো একটানা

সীমাহীন বিধুর আকাশের নীচে মৃত্যুহীন
পাহাড়ের গায়ে উড়ে বৃদ্ধ ও তরুণ বৃক্ষগুলির সতেজ পাতার গন্ধ।
তখন মনে হয় দু’পাশে-সময়ের কষাঘাতে ক্লান্ত শূন্য নিরেট মূর্খ পাথরগুলো
তার উপচে পড়া শূন্যতা দিয়ে মেরে ফেলতে উদ্যত,

শ্বাস রোধ করেই এখনই নেচে উঠবে,
– তাকে হত্যা করা হয়েছে যাকে তুমি ত্যাগ করেছিলে প্রত্যেক জন্মে।
যাকে হিংস্র জীবাণু ধীরে লয়ে খেয়ে ফেলছিল গাছের পরিত্যক্ত গুঁড়ির মতো,
যার অস্থাবর অনুভূতি সাঙ্গু নদীর মতো তীব্র ছিল,
যার পাথরের উপর ঝর্ণা হয়ে পড়তে চেয়ে শুধুই কনা মাত্র ঝরেছিলে তুমি,
তার হা করা মুখের ভেতর থেকে পুরো হৃৎপিণ্ডটা
বের করে পথে ছড়িয়ে দিয়েছি আমরা।

আজ উৎসবপ্রাঙ্গণের ঢাকের শব্দ চতুর্দিকে ধাক্কা
খেয়ে ফিরে আসছে চারটি বোতাম ভাঙা পাঁজরের
ভেতর ইতিহাস প্রসিদ্ধ কোন টাইফুন বা সেই
প্রথম চুম্বন যা ছিল গত সন্ধ্যায়- যুবকের স্নায়ুতে
সর্বগ্রাসী সাইক্লোনের শব্দের মতো ঝঞ্ঝা হয়ে আছড়ে পড়ছে।

এই ঘাতক সর্বস্ব স্মৃতিরা একদিন নিশ্চয়ই খুঁজে নেবে আমাকে,
বিদগ্ধ চেতনার উপর বসে তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে মাটি খুঁড়তে
খুঁড়তে কবর পর্যন্ত টেনে হিঁচড়ে শুইয়ে দেবে।
একদিন অসংখ্য মানুষের সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা বিশৃঙ্খল আমাকে দেখে টিটকারি দিবে
মিরপুর রোডের রিকশাওয়ালা রইচউদ্দিন,
সংসদের বাদাম বিক্রেতা সুমন, বিচিত্র সিগারেট আর টং দোকানের ময়লা ছোট্ট ছেলে ইয়াসিন।

ঢাকার কিলবিল করা তিন কোটি মানুষের ভেতর থেকেও,
ওই শূন্যতার লোবান রোজ আমাকেই পিছু করে অস্থায়ী মৃত্যু-শয্যা অব্দি।

শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য