গ্রামের মানুষ করোনা নিয়ে যা ভাবে

প্রতীকি ছবি। picture-alliance/AP Photos/S. Rahman

প্রতি বছর ঈদ গ্রামের বাড়িতেই উদযাপন করে থাকি। গ্রামের প্রতিবেশী ও জ্ঞাতিদের সাথে সামাজিক সম্পর্ক ও মমত্ববোধ থেকেই ঈদ একসাথে উদযাপন করা হয়। গত নভেম্বর’২০ মাসে বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন পরোপারে। বাবা মারা যাওয়ার পর এটা আমাদের প্রথম ঈদ উল আজহা। গত ঈদ উল ফিতর গ্রামে উদযাপন করি। ঈদ উল ফিতরের পরের দিন  হঠাৎ মা অসুস্থ হয়ে পড়েন, দীর্ঘ প্রায় একমাস হাসপাতালে থাকার পর সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেন। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতি অবনতির প্রেক্ষিতে লকডাউন থাকায় গ্রামে যাওয়াটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। গ্রামে গিয়ে ঈদ করতে পারবেন না জেনেই মা মন খারাপ করে থাকতেন। মায়ের ইচ্ছা আর পরিবারিক টানেই গ্রামে ঈদ করতে ইচ্ছুক।

ইতিমধ্যে সরকার ঈদের আগে এক সপ্তাহের জন্য লকডাউন শিথিল করে দেয়। তাই মায়ের মনে গ্রামে যাবার ইচ্ছাটা আরও প্রবল হতে থাকে এবং আমাদেরকে গ্রামে গিয়ে ঈদ উৎযাপনের জন্য উৎসাহিত করে। প্রতিদিন টিভি নিউজ ও ফেইসবুকের বরাতে জানতে পারছি যে, প্রতিদিনই দেশে করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। টাংগাইলের অবস্থাও নাজুক, প্রতিদিন টাংগাইলে করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যু বৃদ্ধি পাচ্ছে। মনে নানা রকমের শংকা কাজ করছে। ঈদ উৎযাপন করতে গিয়ে আবার না জানি কোন বিপদের মধ্যে পড়ে যাই। তাই কয়েক দিন যাবত গ্রাম ও এলাকার শুভাকাঙ্খিদের নিকট মোবাইলে খোঁজখবর নিতে থাকি। জানতে পারি যে, গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে জ্বরে আক্রান্ত রোগীর রয়েছে, পরিবারের সকল সদস্যই পর্যায়ক্রমে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তাদের বর্ণনা মোতাবেক আমার শংকা হয় যে, এলাকায় করোনার প্রকোভ বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ আক্রান্ত ব্যক্তিদের জ্বর এর পাশাপাশি শরীর ব্যথা, গলা ব্যথা ও খাবারে অরুচি, খাবারে স্বাদ না পাওয়ার লক্ষণ রয়েছে। এই অবস্থার মধ্যে গ্রামে যেতে মনের ভিতর ভয় ও আশংকা কাজ করছে। তারপরও মায়ের খুশি ও প্রতিবেশী এবং জ্ঞাতিত্ববোধ রক্ষার্থে ঈদ উদযাপনের জন্য গ্রামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। 

১৬ জুলাই’২১ গ্রামের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করি। রাস্তায় ঈদে ঘরমুখী মানুষের অনেক চাপ ছিল। রাস্তায় প্রচুর জ্যাম থাকায় বিকল্প রাস্তায় ৬ ঘন্টায় বাড়ি পৌঁছি। গ্রামের বাড়িতে এসেই বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। দীর্ঘদিন পর মা বাড়িতে ফেরায় (বিশেষ করে অসুস্থ থেকে সুস্থ হওয়ায়) মাকে দেখতে গ্রামের প্রতিবেশী ও জ্ঞাতিরা আমাদের বাড়িতে আসে। সমস্যা হচ্ছে কারও মুখে মাস্ক নেই, স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই। প্রতি পরিবারে জ্বর থাকলেও তাদের মনে করোনার কোন আতংক নেই। এ ব্যাপারে তাদের সচেতন করলেও তারা করোনার কোন অস্তিত্ব আছে বলে মনে করে না। জ্বরকে তারা সাধারণ জ্বর বলেই মনে করছে। জ্বরে আক্রান্ত হলেও কেউই করোনা টেস্ট করাতে চায় না। পুরো গ্রামে জ্বরে আক্রান্ত কোন একজন ব্যক্তি করোনা টেস্ট করেছে বলে জানা যায়নি। গ্রাম ঘুরে একজন ব্যক্তিকেও মাস্ক পরতে দেখা যায়নি। তাদেরকে মাস্ক পরার কথা বললে তারা বলে তাদের করোনা হবে না। তাই মাস্ক পরার দরকার মনে করেনা। দেশে এত মানুষ প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে এব্যাপারে তাদের মধ্যে কোন ভয় কাজ করে না। গ্রামের মসজিদগুলোতে নামাজ আদায়কারী মুসুল্লীদেরও মাস্ক পরতে দেখা যায় না। স্কুল কলেজ এবং শিল্পকারখানা বন্ধ থাকায় গ্রামের মোড়ে মোড়ে উঠতি বয়সী ছেলেরা আড্ডা দিচ্ছে, চায়ের দোকানে একত্র হয়ে চা খাচ্ছে, টিভি দেখছে, মাঠে একসাথে খেলা করছে, কারও মাস্ক নেই। গ্রামের মা-চাচীরা একত্রে বসে বিভিন্ন গল্প করছে, চুলে সিঁথি কাটছে, বিভিন্ন প্রয়োজন ও অপ্রয়োজনে এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের মধ্যেই কেউ কেউ জ্বরে আক্রান্ত বা একটু সুস্থ হয়েছে মাত্র।

ঈদের নামাজে অনেক মানুষের সমাগম হবে এবং এলাকায় করোনার বিস্তার বেড়ে যেতে পারে ভেবে স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যান প্রশাসনের সাথে কথা বলে ইউনিয়নের মধ্যে সকল ঈদের জামাত বন্ধ করে দেন এব্যাপারে তিনি সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে প্রতি গ্রামে ঈদের নামাজে অনেক লোকের সমাগম হয় কিন্তু স্বাস্থ্যবিধির ব্যাপারে কেউ কোন ভূমিকা রাখে নাই। আমাদের ঈদের নামাজের জন্য মাস্ক এর ব্যবস্থা করি এই ভেবে যে, পাড়ায় যাতে করোনার বিস্তারটা রোধ করা যায়। ঈদের নামাজে মসজিদে মাস্ক পরতে সকলকে অনুরোধ করা হলেও অনেকেই মাস্ক পরেন নাই। ঈদের নামাযের পর বড় অনুষ্ঠান হচ্ছে কুরবানী করা। এখানেও কেউ মাস্ক পরেনি। আমার মনে সব সময় আতংক বিরাজ করছে যে, এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানে করোনার বিস্তার বৃদ্ধি পায় কিনা। ঈদের দিন ও পরবর্তী কয়েক দিন চলে আত্নীয় বাড়িতে যাতায়াত এবং সকলে মিলে খাবার খাওয়া এবং একসাথে বসে গল্প বা আড্ডায় মেতে উঠা। এখানেও স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই। বরং কেউ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা বললে তাকেই নানা ভাবে হেয় করা হয়। করোনার ভয়াবহতাকে সকলেই স্বাভাবিক রোগ বালাই বলেই উড়িয়ে দিচ্ছে।

আমার ভয় কাজ করে এই ভেবে যে, সত্যি যদি করোনায় কেউ আক্রান্ত হয়ে যায় তাহলে তা গ্রামে ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগবে না। তখন এই ভয়াবহতা থেকে রক্ষার উপায় থাকবে না বলে মনে আশংকা। সব মিলিয়ে আগামীতে করোনার হটস্পট হতে পারে এই অবহেলিত গ্রাম গুলো।

সরকার শহুরে বা নগরের পরিবেশে করোনা রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে যা প্রশংসার দাবিদার। শহর বা নগর জীবনে প্রতিটি পরিবার আলাদা, কারও সাথে কারও তেমন সংশ্রব নাই, তাই এক পরিবার দ্বারা অন্য পরিবার আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। এখানে করোনার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা অপেক্ষাকৃত কম কষ্টদায়ক। শপিংমল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন বন্ধ থাকায় নগরে করোনার বিস্তার নিয়ন্ত্রন করা সহজ হয়েছে। কিন্তু গ্রামে? হ্যাঁ গ্রামে কিন্তু গণপরিবহন নেই, শপিংমল নেই, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নেই, তবে এখানে পরিবারগুলোর মধ্যে সংশ্রব বেশী, পরস্পর পরিচিত এবং একই জ্ঞাতি গোষ্ঠীর। এখানে চলাচলের বিধি নিষেধ বাস্তবায়ন করা কঠিন।

তাই গ্রামীণ জনপদে করোনা রোধ ও নিয়ন্ত্রনে প্রয়োজনীয় করনীয় নির্ধারণ পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। আমার মতে গ্রামীণ সমাজে করোনা রোধে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে:

ক) গ্রামের মসজিদের ইমামদেরকে করোনা রোধে কাজে লাগানো যেতে পারে। ইমামদের মাধ্যমে মসজিদে আসা মুসুল্লিদের মাস্ক পড়তে উৎসাহ করা, পরিবারের সকলকে মাস্ক পড়তে উৎসাহিত করা যেতে পারে।

খ) ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের মাধ্যমে গ্রাম পুলিশসহ টহল প্রদান করা এবং সকলকে মাস্ক পড়তে অনুরোধ করা।

গ) সরকার কর্তৃক পাবলিসিটির মাধ্যমে করোনা সর্ম্পকে জনসাধারণকে সতর্ক করা। আমরা আগে দেখেছি বাল্য বিবাহ রোধ ও কুসংস্কার রোধে পাবলিক সিটির মাধ্যমে সচেতন করা হতো।

ঘ) এলাকার দোকান সমূহে টিভি চালানো বন্ধ করা এবং টিভিতে শুধু খবর প্রচারে বাধ্য করা। এ ব্যাপারে ইউপি চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

ঙ) গ্রামের সচেতন নাগরিকদের নিয়ে করোনা প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা এবং তাদের মাধ্যমে এলাকায় মাস্ক বিতরণ ও জনসাধারণের অযথা চলাচল সীমিত করা। এলাকার বিত্তশালীদের নিকট হতে মাস্ক ক্রয়ের জন্য সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।

চ) গ্রামের ছাত্র শিক্ষকদের দিয়ে মোটিভেশনাল গ্রুপ তৈরি করে তাদের মাধ্যমে সকলকে সচেতন করা। তাদের মাধ্যমে জনসাধারণকে করোনা ভ্যাকসিন গ্রহণে উৎসাহিত করা এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা।

ছ) গ্রামের কেউ জ্বরে আক্রান্ত হলে তাকে ঘর হতে বের হতে না দেওয়া। ডাক্তারের পরামর্শ নিতে উৎসাহিত করা এবং শারিরীক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে করোনা লক্ষণ দেখা দিলে করোনা টেস্ট করাতে উদ্ধুদ্ধ করা। করোনা পজিটিভ হলে কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা। অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা।

উপরোক্ত প্রস্তাবনা সমূহ একান্তই আমার নিজের ভাবনা থেকে নেওয়া। গ্রামীণ জনপদে করোনা রোধ ও নিয়ন্ত্রনে সকলকে যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসা দরকার বলে মনে করি। আশা করি সকলে সচেতন হবেন এবং নিজে নিরাপদ থেকে অন্যকেও নিরাপদ রাখবেন।

লেখক: আবদুল্লাহ আল-হারুন, উন্নয়নকর্মী।

শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য